অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়

মুখবন্ধ

ধর্ম-স্রষ্টা-নৈতিকতা-পরকাল-জীবনের উদ্দেশ্য—এ বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তার ইতিহাস অনেক পুরোনো। বিতর্কেরও। কিন্তু এগুলো নিয়ে গভীর চিন্তার সময় আধুনিক মানুষের নেই। দৈনন্দিন জীবনের চক্রে নিরন্তর ছুটতে থাকা আধুনিক মানুষের কাছে প্রশ্নগুলো গুরুত্বহীন। তাদের চিন্তা আবদ্ধ ‘আজ এবং এখন’ এর গোলকধাঁধাঁয়। এখানে মানুষ বেঁচে থাকে মূহূর্ত থেকে মূহূর্তে, অতি সতর্কতার সাথে হিসেব কষে তোলা সেলফিতে জীবনের সফলতার ছবি আঁকা হয়। সোশ্যাল স্ট্যাটাস আর ভোগের মাধ্যমে জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের সম্মোহনে মন্ত্রমুগ্ধ আমাদের সত্তাগুলোর মালিকানা কিনে নেয় আমাদের কেনা জিনিসগুলোই।

আধুনিক মানুষের কাছে অধিকাংশ সময় যথাযথ গুরুত্ব না পেলেও এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করা ছাড়া নিজ অস্তিত্ব, লক্ষ্য ও গন্তব্য নিয়ে স্পষ্ট ধারণা তৈরি হওয়া অসম্ভব। এ প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার জন্য একদিকে যেমন গভীর চিন্তা, আত্মঅনুসন্ধান এবং আন্তরিক চেষ্টার প্রয়োজন, তেমনই প্রয়োজন বুদ্ধিবৃত্তিক সততার। প্রয়োজন নির্মোহ বিশ্লেষণ এবং অপছন্দনীয় কিংবা অপ্রত্যাশিত সত্যকে মেনে নেওয়ার সদিচ্ছা। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন নিজের সাথে সৎ হওয়া। কারণ এ প্রশ্নগুলো আমাদের এমন সব উত্তরের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় যার তাৎপর্য সুদূরপ্রসারী। এ উত্তরগুলোর প্রভাব তত্ত্বের জগতে সীমাবদ্ধ থাকে না বরং বিমূর্ত চিন্তার জগৎ থেকে বের হয়ে এসে আমাদের বাস্তবতাকে বদলে দেয়। বদলে দেয় আমাদের জীবনবোধ ও দৃষ্টিভঙ্গিকে। সত্যান্বেষণের এ অভিযানে নিজেকে বদলানোর প্রস্তুতি নিয়েই নামতে হয়। বলা বাহুল্য, নিশ্চিন্ত যান্ত্রিকতায় অভ্যস্ততার কালে এমন অভিযানে নামা মানুষের সংখ্যা কম। অধিকাংশ যখন, যেখানে, যেমন দরকার তেমনিভাবে স্রোতে গা ভাসিয়েই সন্তুষ্ট।

দুঃখজনকভাবে যাদেরকে আমাদের দেশে বুদ্ধিজীবী এবং ‘সুশীল সমাজ’ বলা হয়—এ উপলব্ধি, আন্তরিকতা ও সততা তাদের মধ্যে আরও তীব্রভাবে অনুপস্থিত। প্রগতি ও উন্নতির ব্যাপারে পশ্চিম থেকে ধার করা মুখস্থ চিন্তার সাথে সাধ্যের মধ্যে সর্বোচ্চ ভোগের আধুনিক মনোভাবের মিশেলে তৈরি হয় বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের বিচিত্র ‘চেতনা’র! তাই সুশীল বাঙালের ডিসকোর্সে তত্ত্ব থাকে না, তবে তত্ত্বের কচকচি থাকে। আলোচনায় অন্তর্দৃষ্টি থাকে না, থাকে অর্থহীন রেটরিক, পরিভাষা আর সস্তা হিউমারের চেষ্টা। বুদ্ধিবৃত্তিক সততা আর তীক্ষ্ণতা থাকে না, থাকে ভাষাভিত্তিক সার্কাস আর কাব্যিক ক্যারিকেচার। তার আদর্শের ফাংশানে সাহস থাকে না, কিন্তু প্রয়োজন, সুবিধাবাদিতা আর আরামপ্রিয়তা থাকে পুরোপুরিভাবেই। জীবনদর্শনে দৃঢ়তা থাকে না, কিন্তু অক্ষম আবেগ থাকে ভরপুর। কোনো ঝুঁকি নেবার ইচ্ছে থাকে না, কিন্তু "সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে"—এর স্বপ্ন দেখে ২৪×৭।

এ মানুষগুলোর কাছে মানবসভ্যতা ও চিন্তার শিখর হলো ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট। এনালাইটেনমেন্টের কাঠামোর ভেতর থেকে কুড়িয়ে নেওয়া তত্ত্ব ও তাত্ত্বিকতা, সিদ্ধান্ত ও অনুসিদ্ধান্তের জোড়াতালি দিয়ে তারা ‘আলোকিত মানুষের’ এক ছাঁচ তৈরি করে, এবং পুরো সমাজকে এ নির্দিষ্ট ছাঁচে ফেলে ‘আলোকিত’ করতে চায়। রাষ্ট্রের প্রশ্নে সেক্যুলার হওয়া, নৈতিকতার প্রশ্নে উপযোগবাদী হওয়া এবং ধর্মের প্রশ্নে ইসলামের সমালোচনা করা এই ছাঁচের অবিচ্ছেদ্য বৈশিষ্ট্য।

বাঙাল “মুক্ত”চিন্তক, “মুক্ত”মনা, সুশীল, প্রগতিশীলদের একটা নির্দিষ্ট সিলেবাস আছে। আছে মুক্তচিন্তার নির্দিষ্ট মাপের বাক্স। মাসের শুরুতে বাজারের লম্বা লিস্টির মতো তাদেরও একটা চেকলিস্ট আছে। প্রগতিশীল হতে হলে, আধুনিক হতে হলে, সুশীল হয়ে জাতে উঠতে, নিজের গা থেকে গাঁ-য়ের গন্ধ মুছে ফেলে কসমোপলিটান হয়ে উঠতে হলে এই চেকলিস্ট পূরণ করতে হয়। ‘মুক্তচিন্তা’র পূর্ব-নির্ধারিত কাঠামোকে আত্তীকরণ করতে হয়। হতে হয় প্রথাগত ‘প্রথাবিরোধী’। স্বাভাবিকভাবেই এমন পরিবেশ থেকে সৎ ও আন্তরিক উপলব্ধি ও আলোচনা পাওয়া যায় না, আশাও করা যায় না।

স্রষ্টা-ধর্ম-নৈতিকতা-জীবনের উদ্দেশ্য, পরকালের মতো বিষয়গুলো নিয়ে সুশীল বাঙালির আলোচনা চলে এক নির্দিষ্ট পথ ধরে। প্রথাগত প্রথাবিরোধিতার এ পথে হাঁটতে হলে নাস্তিক, অ্যাগনস্টিক নইলে কমসেকম ‘উদার মুসলিম’ হতে হয়। এর বাইরে বাকি সবাইকে উপস্থাপন করা হয় বোকা, পশ্চাৎপদ, এবং ব্রেইনওয়াশড মোল্লা কিংবা মূর্খ হিসেবে। ইতিহাস ও বিজ্ঞানের সিলেক্টিভ রিডিং তুলে ধরে ধর্মকে চিত্রায়িত করা হয় মানবীয় সত্ত্বার উন্নতি ও উন্নয়নের প্রতিবন্ধক হিসেবে আর দেবত্ব আরোপ করা হয় মানবিক বিচার বুদ্ধির ওপর।

ড. হুমায়ুন আজাদ প্রথাগত প্রথাবিরোধিতার এক মূর্ত প্রতীক। বাঙালি ‘মুক্ত’চিন্তকদের মাঝে মহীরুহসম হিসেবে গণ্য হুমায়ুন আজাদের চিন্তা কিংবা দর্শনের ক্ষেত্রে মৌলিক কোনো অর্জন বা কৃতিত্ব নেই। তার ব্র্যান্ডের মুক্তচিন্তা হলো ভাষার কারুকাজ আর আবেগী কথার আড়ালে উপযোগ আর ভোগবাদকে মহিমান্বিত করার চেষ্টা। হুমায়ুন আজাদের অবিশ্বাস হলো আবেগ, কাম ও ভাষাতাড়িত এক নাস্তিকতা, যার উদ্দেশ্য ‘যা খুশি তাই করার’ ইচ্ছাকে সম্মানজনক পোশাক পরানো—সব সীমা, নৈতিকতা ও অপরাধবোধ থেকে মুক্ত হয়ে ইন্দ্রিয়সুখের পেছনে ছুটে বেড়ানোর বিকারগ্রস্ত আত্মরতির আত্মপক্ষ সমর্থনের দুর্বল প্রচেষ্টা। তার জীবনদর্শন; যদি আদৌ একে জীবনদর্শন বলা যায়—পুরোটাই পশ্চিমাদের কাছ থেকে ধার করা। এবং ধার করা সে চিন্তাগুলোর উপস্থাপনাও অতিরঞ্জিত, অসংলগ্ন এবং অনেকক্ষেত্রেই অশুদ্ধ।

স্রষ্টার অস্তিত্ব, মানব অস্তিত্ব ও চেতনার সূচনা, নৈতিকতা ও পরকালের মতো বিষয়গুলোর ক্ষেত্রে কোন প্রশ্নগুলোর উত্তর বিজ্ঞান দিতে পারে আর কোনগুলো বিজ্ঞানেরও আওতার বাইরে পড়ে, সেটুকু বোঝার মতো বিজ্ঞানের বুঝ ড. আজাদের ছিল না। আর এ প্রশ্নগুলোকে সৎভাবে মোকাবিলা করার জন্য প্রয়োজনীয় দার্শনিক বুঝ, উপলব্ধি কিংবা সততা কোনোটাই তার লেখায় চোখে পড়ে না। ড. আজাদের লেখা থেকে ভাষার কারুকাজ ও সাহিত্যিক জিমন্যাস্টিক্স সরিয়ে মূল বক্তব্য ও দাবিগুলোর দিকে তাকালে গুণমুগ্ধ ব্যক্তি ছাড়া বাকি সবার কাছে বিষয়টা পরিষ্কার হয়ে যাবার কথা। সব অর্থেই ড. আজাদ ছিলেন একজন প্রথাগত প্রথাবিরোধী যার জীবনদর্শনের মূল স্তম্ভগুলো হলো ইন্দ্রিয়সুখ, আত্মউপাসনা ও আত্মরতি।

তাই স্রষ্টা-ধর্ম-পরকাল-জীবনের উদ্দেশ্যের মতো মানুষের অস্তিত্বসম্পর্কিত প্রশ্নগুলোর বিতর্কে হুমায়ুন আজাদ বড়জোর একজন দ্বিতীয় শ্রেণীর নকলনবিশ। এক জলজ্যান্ত ক্লিশে। এমন কোনো আলোচনা তার লেখায় আসেনি যা পশ্চিমাদের কাছ থেকে নকল করা না। এবং মজার বিষয় হলো ড. আজাদ এসব ধার করা আলোচনার সবচেয়ে সরলীকৃত, সবচেয়ে স্থূল সংস্করণগুলোকে নিজের বৈপ্লবিক চিন্তা ও প্রথাবিরোধিতা হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। এমন কিছু তার লেখায় নেই যা এ বিষয়ে প্রাথমিক স্তরের পড়াশোনা করা মানুষের অজানা। তার যুক্তিতর্ক এবং সেগুলোর উপস্থাপনা এতটাই দুর্বল যে ভাষার কারুকাজ বাদ দিলে পাঠকের এমন মনে হওয়া অস্বাভাবিক না যে, কোনো মধ্যবয়স্ক অ্যাকাডেমিক নন বরং এগুলোর লেখক কোনো আত্মমুগ্ধ কিশোর। আরেকটু সদয় হলে হয়তো এ প্রসঙ্গে তার আলোচনাকে পশ্চিমা বিভিন্ন লেখক ও দার্শনিকদের রচনা থেকে বিক্ষিপ্ত বিশৃঙ্খলভাবে কুড়িয়ে নেওয়া চিন্তা-শব্দের অতিসরলীকৃত সংকলন বলা যেতে পারে। তবে এমন সদয় আচরণ ড. আজাদের প্রাপ্য কি না, তা নিয়ে জোরালো প্রশ্ন থেকে যায়।

হুমায়ুন আজাদ এবং তার মতো অন্যান্যদের চিন্তা ও জীবনের বাস্তবতা আল-কুরআনে আল্লাহ আমাদের জন্য স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি বলেন -

“তুমি কি তাকে দেখনি, যে তার প্রবৃত্তিকে নিজের ইলাহরূপে গ্রহণ করেছে? তবুও কি তুমি তার জিম্মাদার হবে? তুমি কি মনে করো যে, তাদের অধিকাংশ লোক শুনে অথবা বুঝে? তারা কেবল পশুদের মতো; বরং তারা আরও অধিক পথভ্রষ্ট ।” [ভাবার্থ, সূরা আল ফুরকান, ২৫ : ৪৩-৪৪]

এবং তিনি বলেন,

“তারা বলে, আমাদের পার্থিব জীবনই তো শেষ; আমরা মরি ও বাঁচি। মহাকালই আমাদেরকে ধ্বংস করে। তাদের কাছে এ ব্যাপারে কোনো জ্ঞান নেই। তারা কেবল অনুমান করে কথা বলে ।” [ভাবার্থ, সূরা জাসিয়া, ৪৫ : ২৪]

একথাগুলো উপলব্ধি করতে পারলে ড. হুমায়ুন আজাদ এবং তার মতো অন্যান্যদের নিয়ে আর কিছু বলার প্রয়োজন হয় না। তবে একটা প্রশ্ন থেকে যায়—মৌলিকত্ব ও বিশেষত্বহীন ড. হুমায়ুন আজাদের রচনা নিয়ে বই লেখার কারণ কী? প্রয়োজনই-বা কী?

আমার মতে সারবস্তুর দিক দিয়ে মূল্যহীন হলেও ড. আজাদের চিন্তা ও লেখা বাংলাদেশের প্রগতিশীল, ধর্মনিরপেক্ষ সুশীল-বুদ্ধিজীবীদের বড় একটি অংশের চিন্তা ও চিন্তাগত দেউলিয়ার প্রতিনিধিত্ব করে। নিজ কামনাবাসনা, খেয়ালখুশি ও অভ্যস্ততাকে জায়েজ করার জন্য ঔদ্ধত্য, তাচ্ছিল্ল্য ও অজ্ঞতাভরে ব্রাহ্মণসুলভ উন্নাসিকতায় স্রষ্টা ও ধর্মের বিরুদ্ধে আবেগী তর্ক করে যাওয়া ড. আজাদকে
এক অর্থে প্রগতিশীল, সংস্কৃতিমনা, সুশীল বাঙাল নাস্তিকের আর্কেটাইপ (Archetype) বলা চলে। মুক্তচিন্তার নামে অনলাইনে ইসলামকে গালাগালি করে চলা মুক্তমনাদের অনেকেই নিজেদের ভেতরে হুমায়ুন আজাদকে ধারণ করে। ইসলামবিদ্বেষের ধরন, কারণ, প্রেরণা এবং মানের দিক থেকে এসব ব্লগার ও লেখকদের অনেককেই বলা যেতে পারে হুমায়ুন আজাদের মানসসন্তান। বছরের-পর-বছর তারা পুনরাবৃত্তি করে যায় সেই একই ধরাবাঁধা কুযুক্তি, রেটরিক আর বুদ্ধিবৃত্তিক হাতসাফাইয়ের। তামাদি হয়ে যাওয়া মুখস্থ চিন্তা উগড়ে দিয়ে, নির্দেশিকা হুবহু অনুসরণ করে ধাপে ধাপে ‘প্রথাবিরোধী’ হয়ে ওঠার আপ্রাণ চেষ্টা চালায়।

আর একারণেই নাস্তিকদের আইডল বনে যাওয়া এ মানুষটির চিন্তার দৈন্য, ভ্রান্তি ও অসংলগ্নতা তুলে ধরা দরকার। চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া দরকার যাকে বিপ্লবী-চিন্তাবিদ মনে করে অনুকরণ করা হচ্ছে, বেদীতে বসিয়ে ফুল দেওয়া হচ্ছে, যার অনুকরণে প্রথাবিরোধী সাজা হচ্ছে, সে নিজে স্রোতে গা ভাসানো আত্মমুগ্ধ অনুকরণকারী ছাড়া আর কিছু ছিল না। পাথরের মূর্তির মতো আদর্শিক মূর্তিগুলোও ভাঙা দরকার। রাফান আহমেদ তার লেখায় এ কাজটি করেছেন। হুমায়ুন আজাদের মতো ভাষার কারিকুরি দিয়ে নিজের চিন্তাকে সত্য প্রমাণে ব্যস্ত হননি, বরং প্রতিটি কথার পেছনে প্রয়োজনীয় তথ্য ও তথ্যসূত্র উপস্থাপন করেছেন। দর্শন ও বিজ্ঞানকে নিজ নিজ জায়গায় রেখে আলোকপাত করেছেন ড. আজাদ এবং তার মতো অন্যান্যদের যুক্তি, দাবি, সিদ্ধান্ত ও অনুসিদ্ধান্তগুলোর ওপর মৌলিক ভুলগুলোর ওপর।

অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়—বইটি ‘নাস্তিকদের জবাব’ কিংবা ‘যুক্তির খণ্ডন’ হিসেবে সাজানো হয়নি। বরং নাস্তিকদের উপসংহারগুলোর ভ্রান্তি তুলে ধরার পাশাপাশি ড. আজাদের মতো মানুষদের মনস্তত্ত্ব, চিন্তা প্রক্রিয়া, এবং এর অন্তর্নিহিত অসংলগ্নতার ছবি ফুটিয়ে তুলেছেন। বইটিকে তাই ‘নাস্তিকতার জবাব’-এর বদলে বিজ্ঞান, দর্শন ও যুক্তির আলোকে প্রগতিশীল বাঙাল সুশীলিয় নাস্তিকতা ও ইসলামবিদ্বেষের ব্যবচ্ছেদ বলা যেতে পারে। আমি ব্যাক্তিগতভাবে লেখকের এ সিদ্ধান্তকে সাধুবাদ জানাই, এবং আশা করি অন্যান্য লেখকরাও ‘নাস্তিকতার জবাব’ এবং ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক লেখার গণ্ডি থেকে বেড়িয়ে এসে ঐসব কাঠামো, মতাদর্শ ও সভ্যতার ব্যাপারে মনোযোগী হবেন যেগুলোর প্রভাবে একদিকে নাস্তিকতা কিংবা ধর্মনিরপেক্ষতার নামে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে ইসলামকে বিছিন্ন করার চিন্তা ও চেষ্টা বৃদ্ধি পাচ্ছে অন্যদিকে সমাজ থেকে ইসলামি মূল্যবোধ, আশংকাজনকভাবে হ্রাস পাচ্ছে।

ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা প্রচার এবং বিশুদ্ধ তাওহীদের আহ্বানকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে, মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধের ময়দানে নাস্তিকতা সবচেয়ে প্রকাশ্য শত্রু হলেও দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে ক্ষতিকর শত্রু না। বরং এর চেয়েও আরও ক্ষতিকর ও আগ্রাসী আদর্শিক শত্রু আমাদের অলক্ষেই হয়তো আমাদের ভেতর ঢুকে পড়েছে। আশা করি লেখকেরা এ সত্য উপলব্ধি করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন এবং মুসলিমদের মধ্যে পরাজিত মানসিকতা ও মানসিক দাসত্ব থেকে উত্তরণের রূপরেখা স্পষ্ট করতে সচেষ্ট হবেন।

আসিফ আদনান
লেখক | সম্পাদক
২৬ শে জানুয়ারি, ২০১৯

সম্পাদকের কথা

ইসলামপন্থী তরুণ লেখকদের বইপত্রের শুরুতে ‘সম্পাদকের কথা’ টাইপ শিরোনামে ভারী ভারী কথা লেখার প্রচলন। আমি নিজেও বিভিন্নসময় এ কাজ করেছি। তবে এই বই নিয়ে অলরেডি অনেক ভারী কথা হয়ে গেছে; আমি হালকা মেজাজে দুয়েকটা কথা বলতে চাচ্ছি।

বই সম্পাদনার কাজটা পরিশ্রমের হলেও মজার, কারণ কিছু বিশেষ সুবিধা আছে। যেমন ধরুন বইয়ের লেখায় ভুলত্রুটি থাকলে লোকে লেখককে ধরবে, ছাপানো-বাঁধাই টাইপ ব্যাপারে সমস্যা থাকলে ধরবে প্রকাশককে, সম্পাদক মশাই কিন্তু সমালোচনার ছুরি-কাঁচির আঘাত থেকে বেঁচে যাবেন। তারপর ধরুন সম্পাদক সাহেব লেখকের প্রথম খসড়া পাণ্ডুলিপি পড়ার সুযোগ পান যেটা আর কেউ পায় না। তবে আসল মজা হচ্ছে সম্পাদনার সুবাদে অনেক নতুন নতুন লেখকের সাথে পরিচয় ঘটে, আড্ডা দেওয়া যায়, আইডিয়া শেয়ার করা যায়। আমার মতো অধমের জন্য লেখকদের সান্নিধ্যে আসার এ সুযোগ বড় লোভনীয়, তাই সম্পাদনার প্রস্তাব পেলে হাতছাড়া করতে চাই না।

সমর্পণ–এর ভাইয়েরা যখন ডাক্তার রাফান আহমেদের দ্বিতীয় বইয়ের পাণ্ডুলিপি আমাকে দিতে চাইলেন, তখনও এ বিষয়গুলোই মাথায় কাজ করেছে। তবে সমস্যা হলো উনার লেখার সাথে আমি পরিচিত নই, তাই তাঁর প্রথম বই বিশ্বাসের যৌক্তিকতা-র এক কপি চেয়ে নিলাম। বাসায় ফিরতে ফিরতে বাসে বসে বইটা উলটে পালটে দেখেই বুঝেছি, এ লেখকের ক্ষমতা আছে ব্যতিক্রমী কিছু উপহার দেওয়ার। ‘ব্যতিক্রমী’ বলতে আমি কী বোঝাচ্ছি, সেটা এইবেলা পরিষ্কার করি।

আস্তিকতা-নাস্তিকতা বিষয়ক লেখালেখি ইসলামপন্থীদের থেকে বছর দশেক আগে ব্লগের যুগ থেকেই চলে আসছে। ব্লগগুলোতে যখন ধর্মবিদ্বেষীদের আধিপত্য, তখন কিছু মুখলিস ভাই সময়ের দাবি মেটাতে কলম তুলে নিলেন। সময় তখন বড্ড প্রতিকূল, চারিদিকে নাস্তিকদের দৌরাত্ম্য, রাজনৈতিক আনুকূল্য ও পক্ষপাতকে কাজে লাগিয়ে তারা নিজেদের আদর্শ প্রচারে সর্বত্র হুংকার ছাড়ছে। এর মধ্য থেকে সেই ভাইরা লিখে গেলেন তাদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে, তাদের উত্থাপিত আপত্তিগুলোর জবাব দেওয়ার চেষ্টা করলেন সাধ্যমতো।

সেই ভাইরা নানা পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। কেউ হয়তো রাজনৈতিক আক্রোশের শিকার হয়ে ব্যক্তিগত জীবনে বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছেন, কাউকে হয়তো পাড়ি জমাতে হয়েছে দূরদেশে। অনেকেই হয়েছেন বিস্মৃত। এমন কি তাঁদের লেখাগুলো সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না তা-ও আমি জানি না। যদি না-ও হয়ে থাকে, নিঃসন্দেহে এটুকু বলা যায়, তাঁরা যে সিঁড়িগুলো বানিয়ে দিয়েছেন, সেগুলো বেয়েই উঠে এসেছেন আজকের তরুণ লেখকরা। নাস্তিকতা বিষয়ক হাল আমলের বইগুলোতে সেই মুখলিস ভাইদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ না করাটা আমার অন্যায় বলে মনে হয়।
ব্লগের যুগ পেরিয়ে আমরা ঢুকলাম ফেসবুক যুগে, এরপর এলো বইয়ের যুগ। নাস্তিকদের জবাব দিয়ে লেখাগুলো কাগজের পাতায় উঠে এলো, মলাটবদ্ধ অবস্থায় ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল। দেখা যায় এই বইগুলোর সিংহভাগেই নাস্তিকদের জবাব দেওয়াটাকেই ফোকাস করা হয়। এই ধারাটার অবশ্যই দরকার আছে, তবু মনে হতো যদি এমন একটা বই লেখা হতো যেখানে তাদের প্রশ্ন ধরে ধরে জবাব না দিয়ে বরং তারা যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে এসব আপত্তি তোলে, সেই ভিত্তিটাকেই নাড়িয়ে দেওয়া যাবে! এতদিন তারা আমাদের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করেছে, আমরা উত্তর দিয়েছি, এবার আমরা তাদের (অ)বিশ্বাসকে প্রশ্ন করবো, তারা জবাব দিক! এই ধারার বইপত্রের আশা অনেকদিন ধরেই করছিলাম।

সেই আশার পালে হাওয়া দিলেন রাফান আহমেদ ভাই। তিনি লিখলেন ‘বিশ্বাসের যৌক্তিকতা’, খুব ছোট্ট কিন্তু ওজনদার এ বইটা হচ্ছে ট্রেইলার। ট্রেইলারের কুঁড়িটা পুষ্প হয়ে ফুটল ‘অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়’– এ।

‘অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়’– এর পাণ্ডুলিপি পড়তে গিয়ে দুটো কারণে বিস্মিত হই। প্রথমটা হলো মুগ্ধতাজনিত বিস্ময়। পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল–আরে এটা তো সেই ধারার বই যার জন্য অ্যাদ্দিন ধরে অপেক্ষা করেছি! আর দ্বিতীয় কারণ হলেন লেখক নিজে। রাফান ভাই পেশায় চিকিৎসক। উদয়াস্ত খাটছেন রোগীদের পেছনে, রাতের পর রাত জাগছেন, এতটুকু ফুরসৎ নেই। ওনার সাথে যখন পাণ্ডুলিপি নিয়ে আলোচনায় বসেছি তখনও একটু পরপর ফোন আসছে হাসপাতাল থেকে। এমন আদ্যন্ত ব্যস্ত একজন মানুষ এত তথ্যবহুল আর গভীর আলোচনার পৌনে তিনশো পৃষ্ঠার প্রমাণ সাইজের একটা বই লিখে ফেলেছেন, বিশ্বাস করা কঠিন। আসলে আল্লাহ্‌ যাকে দিয়ে চান তাকে দিয়ে করান।

বইটাকে ‘ব্যতিক্রমী’ বলছি এজন্যই যে, এটা টিপিক্যাল ‘নাস্তিকদের আপত্তির জবাব’ টাইপ লেখা না। এখানে লেখক হুমায়ূন আজাদদের মনস্তত্ত্ব, তাদের আদর্শের স্ববিরোধিতা এবং তারা অবিশ্বাসের মোড়কে যে সংকীর্ণ বিশ্বাসগুলো লালন করে সেগুলোকে দর্শন ও বস্তুবাদী বিজ্ঞানের আলোকে উন্মোচন করেছেন। বইটার গুরুত্ব আরো বেড়েছে একারণে যে লেখক মুসলিম স্কলারদের থেকে খুব বেশি সাহায্য না নিয়ে বরং হুমায়ূন আজাদরা যে পশ্চিমা দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকদের বক্তব্যকে প্রবাদতুল্যজ্ঞান করে, সেই দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকদের বক্তব্য দিয়েই আজাদদের চিন্তার দৈন্যকে স্পষ্ট করেছেন।

বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ের টপিকগুলো এত ব্যাপক যে, এর প্রতিটি নিয়েই একেকটি বই হওয়া সম্ভব। এগুলোকে একই বইয়ে স্থান দিতে গিয়ে অনেকস্থানে লেখক আরো বিস্তারিত আলোচনা করতে পারেন নি। আমরা আশা করবো তিনি এবং এই পথের অন্য পথিকরা সে বিষয়গুলো নিয়ে আরো বৃহৎ কলেবরে, আরো বিশ্লেষণাত্মক আলোচনাসমৃদ্ধ লেখা আমাদের উপহার দেবেন।

পাঠকরা বিশেষভাবে লেখকের কলমের উত্তরোত্তর বারাকাহ বৃদ্ধির জন্য দুআ করতে ভুলবেন না। সেই সাথে বইটির সাথে সংশ্লিষ্ট বাকিদের জন্যও। এই ‘বাকি’দের মধ্যে যে সম্পাদক মশাই নিজেও আছেন, তা বোধহয় না বললেও চলছে!
বইয়ের ভুলত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা নিয়ে যেকোন গঠনমূলক সমালোচনা সাদরে গৃহীত হবে। মিথ্যার আদর্শের বিরুদ্ধে মুসলিমদের বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলনে এ বইটি একটা দৃষ্টান্ত হয়ে যাবে, এ প্রত্যাশা রাখছি। নিশ্চয়ই আল্লাহ্‌ ব্যতীত কোনও তৌফিকদাতা নেই।

মুহাম্মাদ জুবায়ের
সম্পাদক, অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়

একাডেমিকের চোখে

রাফান আহমেদের ‘অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়’ বইটির পাণ্ডুলিপি পড়লাম। এর আগে নতুন করে পড়লাম হুমায়ুন আজাদের ‘আমার অবিশ্বাস’। দেখলাম, হুমায়ুন আজাদের খণ্ডিত যুক্তিগুলোকে রাফান আহমেদ হুলুস্থুল রেফারেন্স আর যুক্তির বোমাবর্ষণে রীতিমতো ধ্বসিয়ে দিয়েছেন।

আমি ফিলোসফির লোক। আমার দৃষ্টিতে অবিশ্বাসও বিশ্বাসের একটা ধরন। জ্ঞানমাত্রই মূলত এক ধরনের বিশ্বাস। যদিও বিশ্বাস মাত্রই জ্ঞান নয়। প্লাটোর বরাতে আমরা জানি, জ্ঞান হলো যাচাইকৃত সত্য বিশ্বাস। অবিশ্বাসও যে এক ধরনের বিশ্বাস তা নাস্তিক্যবাদের অনুসারীদের মধ্যে কেউ কেউ অবশ্য আজকাল স্বীকার করে নিচ্ছেন। আমাদের এখানকার একজন শ্রদ্ধেয় তাত্ত্বিক ‘চাই বিশ্বাস চর্চার অধিকার, বিশ্বাস চর্চার স্বাধীনতা’ শিরোনামে একটা নিবন্ধ লিখেছেন। এর প্রথম বাক্যটি হলো, ‘মানুষ আদতে বিশ্বাসী; বিশ্বাসী হতে পারে প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মে, বিশ্বাসী হতে পারে যুক্তি-দর্শন-বিজ্ঞান কিংবা প্রাকৃতিক কোনো বিষয়ে।’

হুমায়ুনের অবিশ্বাস নামক বিশ্বাসের তাত্ত্বিক ভিত্তি হলো নিহিলিজম। শূন্যতাবাদ বা নৈরাজ্যবাদ। এর মানে হলো, শেষ পর্যন্ত কিছু নাই। আছে শূন্যতা। জীবন ও জগতের কোনো অন্তর্গত উদ্দেশ্য নাই। এটি হলো সব ধরনের নাস্তিক্যবাদের মূল দর্শন। এ ধরনের অর্থহীনতাবাদীদের সাথে কথা বলার বিপদ হলো, আপনি যা-ই বলেন না কেন, তিনি আপনার তো নয়ই, উনার নিজের কোনো কথারও কোনো দায়-দায়িত্ব নিবেন না। যিনি অজ্ঞেয়বাদী তাকে যেমন না জানার জন্য দায়ী করা যায় না, তেমন করে নিহিলিস্ট কেউ যখন কোনো কিছুর পক্ষে বা বিপক্ষে কিছু বলেন, সেটাকেও তেমন গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা অর্থহীন। বুঝতেই পারছেন, অর্থহীনতাবাদ নিজেই নিজেকে নাকচ করে। এটি স্ববিরোধী।

অবশ্য, বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী ও ফলস দাম্ভিকদের জন্য এটি এক মারাত্মক অস্ত্র। এ ধরনের শিক্ষিত-মূর্খদের সাথে এনগেইজ হওয়াটাই বরং ভুল। তারপরও আমরা তাদের সাথে এনগেইজ হই। তাদের লেখার কাউন্টার করি। কেন করি জানেন? তারা যেসব সরলপ্রাণ তরুণদেরকে কথার ফুলঝুড়ি দিয়ে বিভ্রান্ত করেছে, অথচ যাদের বুদ্ধি-বিবেচনা এখনো পুরো লোপ পায়নি, তাদেরকে সহযোগিতা করার জন্যই এসব রিবাটাল-রিভিউ-কাউন্টার রাইট-আপ।

সমকালীন জ্ঞানতত্ত্ব, অন্টলজি, এমনকি দর্শন সম্পর্কে প্রাথমিক পর্যায়ের লেখাপড়া যদি হুমায়ুন আজাদের থাকতো তাহলে তিনি বলতে পারতেন না, ‘বিশ্বাস মাত্রই অপবিশ্বাস, জ্ঞান বিশ্বাসের বিষয় নয়’। ধর্মের অসারতা প্রমাণ করার জন্য তিনি বলছেন, ‘যা প্রমাণ করা যায় না তা অবৈজ্ঞানিক’। বিজ্ঞান আর ধর্মের মাঝামাঝি যে দর্শনের স্থান, তা তার মতো স্বল্পবুদ্ধির পপুলিস্ট কীভাবে জানবেন? জানার জন্য সত্যিকারভাবে মুক্তমনা হওয়া লাগে। ঐকান্তিকতা ও সততা লাগে। বাংলাদেশে নাস্তিকতার অন্যতম পয়গম্বর ড. আজাদের মধ্যে এসব মৌলিক মানবীয় গুণাবলী ছিল অবিশ্বাস্য পরিমাণে কম। তাঁর ‘আমার অবিশ্বাস’ পড়ে আমি এমনটাই বুঝলাম।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দর্শন কোনো প্রমাণ দেয় না। দেয় যুক্তি। গ্রহণযোগ্য যুক্তিকে দিন শেষে ব্যক্তি হিসাবে আমরা প্রমাণ হিসাবে গ্রহণ করে। দাবী করি। দর্শন বরং প্রমাণের প্রামাণিকতা বা অন্টোলজি নিয়ে এনগেইজ হয়। হুমায়ুনের মতো দর্শন-অজ্ঞ অতি আত্মবিশ্বাসী দাম্ভিক পারভার্টেডের কাছে এসব জানা থাকার কথা নয়। আফসোস, তিনি যদি অন্তত ফিলোসফি অব সায়েন্স সম্পর্কে কিছুটা পড়ালেখা করতেন তাহলে হয়তোবা এতটা অন্ধ বিজ্ঞানপূজারী, আমার ভাষায় বিজ্ঞানবাদী হতেন না।

ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ‘এ বইগুলো কিছু প্রমাণ করে না; এগুলো বিধাতার উক্তি দিয়েই প্রমাণ করে বিধাতাকে আর তার সৃষ্টিকে’। অথচ, কোরআনের প্রায় এক তৃতীয়াংশ আয়াতে মানুষের চেনা-জানা জগতের ইন্দ্রিয়জ ও বুদ্ধিগত নানা বিষয়কে রেফার করে মানুষকে স্রষ্টাবিশ্বাসের প্রতি আহ্বান ও উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। হুমায়ুন আজাদ যদি কোরআন পড়তেন তাহলে তিনি এমন ভুল কথা বলতে পারতেন না। যারা ফিলোসফি সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না, কিন্তু লেখাপড়া জানে, তারা আর কিছু না হোক ক্রিটিক্যাল থিংকিং আর ফ্যালাসি সম্পর্কে অন্তত খানিকটা ধারণা রাখেন। অথচ, বঙ্গীয় নাস্তিকতার অন্যতম গুরু হুমায়ুন আজাদের মধ্যে এর ছিটেফোঁটাও নাই। কথাগুলো বলতে আমার খুব খারাপ লাগছে। কিন্তু উনার বই পড়ে আমার এমনটাই মনে হয়েছে।

কন্টেন্টের কারণে নয়, একতরফা খোলামাঠে ফাঁকা গোল দেয়ার মতো করে শিক্ষিত বাংলাভাষীদের মধ্যে ইতোমধ্যে হুমায়ুন আজাদের বইটি বহুলভাবে পঠিত হয়েছে। এ কারণে এই বইটির প্রতিপাদ্য বিষয়ের প্রত্যুত্তর হিসাবে রাফান আহমেদের ‘অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়’ বইটির প্রকাশ অত্যন্ত সময়োপযোগী হয়েছে। এ ধরনের বই আরো লিখতে হবে। নাস্তিকতার প্রচার করে, এমন প্রতিটা বইয়ের কমপক্ষে দশটি করে রিভিউ ছাপা হওয়া উচিত। কারণ, একেক ধরনের লেখক একেক দিকে ফোকাস করে লেখেন। বিষয় বিবেচনায় রাফান আহমেদের এই বইটি বেশ সংক্ষিপ্ত। অবশ্য এর মানে এই নয় যে, হুমায়ুন আজাদের বইটা খুব সমৃদ্ধ। বরং তার উল্টো। নিতান্ত খাপছাড়া, অযৌক্তিক ও অপ্রাসঙ্গিক কথা দ্বারা বইটা পূর্ণ। কথার প্রাসঙ্গিকতা খুবই দুর্বল। স্বশিক্ষিত আরজ আলী মাতুব্বরের লেখার যে মান, অধ্যাপক হুমায়ুন আজাদের লেখার মান তারচেয়ে উন্নত নয়। প্রায় জায়গাতে তিনি এক পৃষ্ঠায় যা বলেছেন ঠিক তার পরের পৃষ্ঠাতেই এর বিপরীত কথা বলেছেন। খুব কম বই-ই আমি এতটা মনোযোগ ও এতটা ধৈর্য সহকারে পড়েছি। এ ধরনের ভুলত্রুটিপূর্ণ, অসংগতিতে ভরপুর ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত লেখার রিভিউ করা দুঃসাধ্য ব্যাপার।

উনার যুক্তির মেজর ফ্লগুলো দেখিয়ে দিতে হলে আমাকেই বরং কয়েকটা ঢাউস সাইজের বই লিখতে হবে। অবশ্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বটম-লেভেলের কাণ্ডজ্ঞান ও বুদ্ধিবিবেচনা সক্রিয় থাকা সাপেক্ষে হুমায়ুন আজাদের মতো বুদ্ধি-ব্যবসায়ীদের দ্বারা সংক্রমিত যুক্তিবিরোধী অবিশ্বাসের ভাইরাস হতে সুরক্ষা বা এ ধরনের প্রাণঘাতী সংক্রমণ হতে বাঁচার জন্য রাফান আহমেদের অত্যন্ত চমৎকার এই বইটা যে কারো জন্য যথেষ্ট হতে পারে।

মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক
সহযোগী অধ্যাপক, দর্শন বিভাগ
দক্ষিণ ক্যাম্পাস
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

 

২০ জানুয়ারি, ২০১৯

প্রারম্ভ

সকল প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা মহান আল্লাহর নিমিত্তে। সালাত ও সালাম বর্ষিত হোক মানবতার আদর্শপুরুষ মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহ (ﷺ)-এর ওপর, যিনি তাঁর রবের অনুমতিক্রমে অমানিশার মেঘ চিরে মানবতাকে পথ দেখিয়েছেন আলোর জোয়ারের দিকে। শান্তি বর্ষিত হোক তাঁদের ওপর যারা একনিষ্ঠভাবে সেই আলোকে ধারণ করেছেন, করছেন, করবেন।

আজকের এই আয়োজনের হেতু মূলত সত্যান্বেষণের প্রয়াস। বাংলা সাহিত্যের জগতে প্রথাবিরোধী ও বহুমাত্রিক মননশীল লেখক হিসেবে পরিচিত অন্যতম ব্যক্তিত্ব হলেন অধ্যাপক ড. হুমায়ুন আজাদ। যিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, ঔপন্যাসিক, কিশোর-সাহিত্যিক, ভাষাবিজ্ঞানী, সমালোচক হিসেবে পরিচিত। সামসময়িকদের কাছে তিনি আবার কুম্ভীলক (Plagiarist - রচনাচোর) হিসেবেও সমালোচিত। ব্লগপূর্ব যুগের নাস্তিকতাপন্থী লেখালেখিতে যে-কয়জনের নাম চলে আসে তাদের মাঝে তিনি অন্যতম।

১৯৪৭ সালের এপ্রিল মাসের প্রচণ্ড বৈশাখে নানাবাড়ি কামারগাঁয়ে জন্ম হয় অধ্যাপকের। বেড়ে ওঠেছেন বিক্রমপুরের রাড়িখালে। পিতৃপ্রদত্ত নাম ছিল হুমায়ুন কবির, কিন্তু পরে নাম বদলিয়ে হয়ে যান হুমায়ুন আজাদ। ধর্ম, প্রথাবিরোধিতা, মৌলবাদ, নিঃসংকোচ যৌনবাদিতা, নারীবাদ, রাজনীতি নিয়ে তিনি কলম চালিয়েছেন অন্তিম শয়ান পর্যন্ত। উনার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ষাটের বেশি, যার মাঝে সমালোচনা গ্রন্থই বাইশটি।

তিনি নিজেকে গর্বভরে অবিশ্বাসী হিসেবে পরিচয় দিতেন। স্বীয় অবিশ্বাসের নেপথ্যে কথামালা সাজিয়েছেন আমার অবিশ্বাস গ্রন্থে। বাংলাদেশে নাস্তিকতাবাদের মুখপাত্র মুক্তমনা ব্লগে আমার অবিশ্বাস বইটি সম্পর্কে বলা হয়েছে -

“তিনি আরো লিখেছেন আমার অবিশ্বাস । যার তীব্র আলোয় আলোকিত হয়েছে হাজারও তরুণ প্রাণ ।” [1]

এই বইটির বিভিন্ন অধ্যায়ে তিনি বিশ্বাস, ধর্ম, ধর্মীয় নৈতিকতাকে আক্রমণ করেছেন। উনার আক্রমণ থেকে বাদ যায়নি রাজনীতিবিদ ও খ্যাতনামা কবিরাও। তিনি কলমের আঘাতে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন বিশ্বাসের অসারতা আর প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছেন অবিশ্বাসের মনস্তত্ত্ব। ধর্মকে সমালোচনার ক্ষেত্রে উনি মূলত হিন্দু ও খ্রিস্টান ধর্মের ওপরই আলোচনা করেছেন বেশি, প্রসঙ্গক্রমে ইসলামও চলে এসেছে। যদিও আলোচনায় আমরা দেখব ইসলাম সম্পর্কে উনার অনুধাবন কতটা ত্রুটিপূর্ণ।

বাংলাদেশ সেক্যুলার হিউম্যানিস্ট মুভমেন্ট - এর ফেইসবুক পেইজে হুমায়ুন আজাদের এক ভক্ত লিখেছেন :

“হুমায়ুন আজাদের মূল্যায়ন তাঁর অন্ধ ভক্তরা করতে পারবেন না, সেটা এক নতুন পীরবাদের জন্ম দিবে । হুমায়ুন আজাদের অবস্থান নির্ণয় করার জন্যে তাঁর যৌক্তিক সমালোচনাই মুখ্য ।” [2]

এ গ্রন্থ অবতারণার উদ্দেশ্য হলো, উনার আরোপিত অভিযোগগুলোকে খতিয়ে দেখা যুক্তি, দর্শন, বিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্মতত্ত্বের কাঠগড়ায়। বিচার করা হবে, যাচাই করা হবে উনার অবিশ্বাস আসলেই কতটা ভিত্তিপূর্ণ। আসলেই কি তিনি প্রথাবিরোধী, নাকি নিজের প্রথার বলয়েই চক্রাকারে ঘুরে বেড়িয়েছেন তাও স্পষ্ট হয়ে যাবে আশা করি। আলোচনার ক্ষেত্রে মূলত আমাদের সহজাত বা মৌলিক চিন্তা ক্ষমতাকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। জটিল দার্শনিক আলোচনা, বৈজ্ঞানিক ভারী ভারী পরিভাষা টেনে এনে নিরস করার চেষ্টা পরিহার করা হয়েছে সাধ্যমতো।

বক্ষ্যমাণ গ্রন্থে হুমায়ুন আজাদের উত্থাপিত দাবি ও অভিযোগগুলোকে অধ্যায়ভিত্তিক আলোচনা করা হয়েছে। মূল বইয়ের বিভিন্ন অধ্যায়ে একই রকম অভিযোগ এসেছে ঘুরেফিরে। তাই সেগুলোকে এক শিরোনামের অধীনে নিয়ে আসা হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হয়েছে যাতে গবেষক পাঠকগণ তথ্যের বিশুদ্ধতা ও সংহতি যাচাই করতে পারেন। একই সাথে প্রতিটি তথ্যের সূত্র উল্লেখ করা হয়েছে যাতে করে অনুসন্ধান পিপাসু পাঠকগণ তাদের পিপাসা মেটাতে পারেন।

মহান আল্লাহর প্রতি অন্তরের গহীন থেকে কৃতজ্ঞতা, তিনি আমাকে আরও একটি বইয়ের কাজ সম্পন্ন করার তৌফিক দিয়েছেন। একই সাথে কৃতজ্ঞতা জানাই ভাই আরিফ আজাদ, মুশফিকুর রহমান মিনার, ডা. শামসুল আরেফীন শক্তি, উস্তাদ আব্দুল্লাহ আল-মাসুদ, জাকারিয়া মাসুদ, অনুবাদক আরিফুল ইসলাম ও মোহাম্মদ মোজাম্মেল হক স্যারকে, যাদের পরামর্শ ও তথ্য দ্বারা আমি উপকৃত হয়েছি। আরও ধন্যবাদ জানাই ইসমাইল হোসেন ও রোকন উদ্দিন ভাইকে, একেবারে শুরু থেকে তাঁদের ঐকান্তিক সমর্থনের জন্য।
মানবীয় কর্মে ভুলত্রুটি থাকাই স্বাভাবিক। এটাও তার ব্যতিক্রম নয়। সচেতন পাঠকের নিকট যদি কোনো ভুল ধরা পড়ে তবে যৌক্তিক প্রমাণসহ জানানোর আহ্বান রইল।

এই বইয়ের যা কিছু কল্যাণকর তা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যা ভুলচুক তা আমারই কারণে। পরম-জ্ঞানী আল্লাহর নিকট প্রার্থনা, তিনি যেন প্রত্যেক সত্যসন্ধানী অন্তরকে সত্যের পথ দেখান, আমাদের সকলকে আলোর পথে অবিচল রাখেন, আমীন।

ডা. রাফান আহমেদ

 

Reference :

1. সাইফুল ইসলাম, হুমায়ুন আজাদ মানে, সত্যের বুলেটে মিথ্যে আবেগের তীক্ষ্ণ জলাঞ্জলি। মুক্তমনা ব্লগ, ফেব্রুয়ারি 27, 2011

2. http://archive.is/yuzv8

সূচীপত্র

মুখবন্ধ
সম্পাদকের চোখে
প্রারম্ভ

অবিশ্বাসীর বিশ্বাস
বিশ্বাসের সাতকাহন
ধর্ম নিয়ে যত কথা
ওপারে
অবিশ্বাসের ভাইরাস
আমার বিশ্বাস

বিদায় বেলায়
গ্রন্থপঞ্জী
নির্ঘণ্ট

রিভিউ

হুমায়ুন আজাদের ‘আমার অবিশ্বাস’ হলো মুক্তিবুদ্ধি চর্চার নামে নির্জলা মিথ্যাচারের সমাবেশ। সাধারণ পাঠককে বিভ্রান্ত করতে বইটিতে তিনি স্রষ্টা, ধর্ম ও বিশ্বাস নিয়ে অ-যুক্তি ও কুযুক্তির আবর্জনা উদ্‌গিরণ করেছেন। যেই বিজ্ঞানে আজাদ সাহেবদের অন্ধবিশ্বাস, সেই বিজ্ঞানের অসংখ্য রেফারেন্স দিয়েই রাফান আহমেদ উক্ত আবর্জনাকে ধুয়েমুছে পরিস্কার করে দিতে সচেষ্ট হয়েছেন তার নতুন বই-এ। ‘অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়’ নাস্তিকতার অন্ধকূপে যুক্ত করেছে আরেকটি আলোর মশাল।

- ডা. আবদুল্লাহ সাঈদ খান, এমবিবিএস (ঢাকা), বিসিএস (স্বাস্থ্য)
সহলেখক : প্রত্যাবর্তন

২০১৭ সালে একটি আলোক মশাল জ্বলে উঠেছিল। অন্ধকারের তেলাপোকাদের পানির ছিটায় নেভানো যায়নি তাকে। মশালটা এখন বিশাল আগ্নেয়গিরিতে রূপান্তরিত হয়েছে। সে আগ্নেয়গিরির উত্তাপে ধরণির যত জঞ্জাল আছে সব ধুয়ে-মুছে সাফ হয়ে যাবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা। সতেরোতে জ্বলে ওঠা মশালটিকে যত্নে আগলে রেখে সেটাকে আগ্নেয়গিরিতে পরিণত করতে যারা লড়াই করেছেন, তাদের অন্যতম সারথি ডা. রাফান ভাই। আল্লাহ তার লেখায় বারাকাহ দান করুন। আমীন।

- জাকারিয়া মাসুদ, লেখক : সংবিৎ, ভ্রান্তিবিলাস | সহলেখক : সত্যকথন, প্রত্যাবর্তন

হুমায়ুন আজাদ অনেকগুলো দুষ্ট পোকা ছেড়ে গেছেন কিছু কিছু তরুণের মাথায়। সেই পোকাগুলো তাদের কুটকুট কামড়ায় আর সেই কামড়ের বিষে আক্রান্ত হয়ে এরা কেন যেন কামড়াতে ছোটে মুসলিমদের। যদিও সেই কামড়ে না আছে প্রজ্ঞা না আছে বোধ। তবুও তারা কামড়াতে ছোটে। এটা আসলে অসুস্থতা, মানসিক অসুস্থতা। তবে এই অসুস্থতায় হতাশ হবার কিছু নেই। এর ঔষধ এসে গেছে! এই অসুখের চিকিৎসা করতে গেলে, হুমায়ুন আজাদের ছেড়ে দেওয়া দুষ্ট পোকাগুলো মাথা থেকে বের করতে খেতে হবে… থুক্কু, পড়তে হবে—‘অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়’!

- আখতার মাহমুদ | সাহিত্যিক | লেখক : অবিশ্বাসীর মনস্তত্ব

৯/১১ এর পর নব্য-নাস্তিকতার উত্থানে অসংখ্য মনন অবিশ্বাসের ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে পড়ে। মিডিয়া সাপোর্ট দিয়ে নব্য-নাস্তিকদের ওয়ার্ল্ডভিউকে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। যার আক্রমণে বহু মুসলিম তরুণ দিশেহারা হয়ে গেছে। যদিও ব্যক্তি হিসেবে হুমায়ুন আজাদ এখন তেমন একটা চর্চার বিষয় নয়; তবে তাঁর লেখার মাঝে নাস্তিকতার যে চিন্তাধারা পাওয়া যায়, তার সাথে নব্য-নাস্তিকদের অনেক মিল রয়েছে। এসকল চিন্তাধারার পেছনে লুকিয়ে থাকা অনেক কথা ফুটে উঠেছে বক্ষ্যমাণ বইতে। ভিন্ন ধাঁচের এই বইটি এমন সময় খুবই দরকার ছিলো, আশা করি মননশীল পাঠকসমাজে বইটি সমাদৃত হবে।

- জনি ব্যাসিল
নিউক্যাসল, যুক্তরাজ্য
ডিস্ট্রিবিউশন ম্যানেজার, iERA

অনলাইনে কিনতে ক্লিক করুন