Islam

ফানুসকথন

By

ঘুটঘুটে রাত। শহরে আসলে ঘুটঘুটে রাত অনুভব করা যায় না। এদিক-সেদিকের নানান রঙবেরঙের আলোতে গহীন রাতের আমেজ ম্লান হয়ে যায়। বাসার এদিকটা রাস্তা থেকে বেশ ভিতরে। চারিপাশে গাছাগাছালি বেশ। দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো যায় আর কি। আসলাম সাহেব আজ কবিতা লিখবেন ভেবেছিলেন। জীবনের ব্যস্ততায় বহু দিন কবিতা নিয়ে বসা হয় না। উনার কবিতার একটা খাতা আছে। উপরে বড় বড় করে লেখা, “তোমার সাথে”। অবসর পেলে একটু আকটু কবিতা চর্চা করেন। তবে সবসময় তো আর আমেজ আসে না। আজ মনস্থির করেছিলেন দু-চার লাইন লিখবেন। তার আবার ফাউন্টেন পেন দিয়ে কবিতা লিখার অভ্যাস। কলমটা যেই তুলতে যাবেন, তখনই দ্রুম করে শব্দ হলো!

আসলাম সাহেব বিরক্ত হয়ে ভ্রু কুচকালেন। আরে হলোটা কি? বাংলাদেশে আছি, সিরিয়া বা ইরাকে তো নেই। বোম ফেলছে কে? রাগে গজগজ করতে করতে বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন। আকাশের দিকে চাইতেই দেখেন গাঢ় কমলা রঙের ফানুসে আকাশ ভর্তি। দেখতে বেশ সুন্দরই লাগছে বলতে হবে। চারদিকে পটাশ পটাশ শব্দ হচ্ছে। আজ কি দিওয়ালী নাকি? মাথা চুলকালেন। সহসা মনে পড়ল, আরে আজকে না ৩১ ডিসেম্বর! সারসে রে! থার্টি ফার্স্ট নাইট, রাতের ঘুমের তেরোটা বাজল! কবিতা লেখার ইচ্ছের তো আগেই চৌদ্দটা বেজে বসে আছে।

হঠাৎ তার ফানুস সম্পর্কে জানতে মন চাইল। কি করা যায়? হুম, গুড আইডিয়া। হাফিজকে ফোন দিই। ও কিছু না কিছু বলতে পারবেই।

– হ্যালো
– হ্যা, হ্যালো। কিরে মদন, কবিতা লেখার ইচ্ছে শেষ নাকি?
– আর বলিস না, চারপাশের যা অবস্থা। আমি মনে করতাম বাংলাদেশ মুসলিম দেশ! ভুল ভাবতাম দেখছি। আচ্ছা এই ফানুসের কাহিনী বল তো হাফিজ।

হাফিজ বরাবরের মতো গলা খাকাড়ি দিয়ে বলল,
– হুম জানতাম, পড়াশোনা তো কিছু করিস নে, খালি ‘আমি আলু-তুমি পটল’ মার্কা কবিতা লিখে বেড়াস। শোন মনোযোগ দিয়ে।

নাহ! ভাবলেন আসলাম সাহেব, আমাকে আন্ডারএস্টিমেট করা এই বদটার স্বভাবে পরিণত হয়েছে। মুখে কিছু বললেন না। হাফিজ সাহেব বলে চললেন

– বিজ্ঞান ইতিহাসবিদ যোসেফ নিধামের মতে, স্কাই ল্যানটার্ন বা ফানুসের জন্ম বেশ আগে, খ্রিস্টপূর্বাব্দ তৃতীয় শতকে। ইট ইস মেইড ইন চায়না, হে হে বুঝলি গরু? প্রথম চিনা সাম্রাজ্য গড়ে ওঠার শুরুর দিকে মূলত সংকেত পাঠাতেই এর ব্যবহার শুরু করে সেনাবাহিনী। চিনা উপকথা অনুসারে এই বিশেষ লণ্ঠনের আবিষ্কর্তা হলো যুদ্ধবাজ সন্ন্যাসি ঝুগে লিয়্যাং, যাঁকে ভক্তরা “কংমিং” নামে ডাকত। তাঁর নামানুসারে শূন্যে ভাসমান লণ্ঠনের নাম হয় ‘কংমিং ল্যান্টার্ন’।

কেউ আবার মিশরীয় ইতিহাসবিদ আল-মাক্বরিযির বরাতে বলেছেন, এই বাতিগুলো খ্রিস্টীয় বিভিন্ন উৎসব উদযাপনের সময় ব্যবহৃত হত।

এদিকে বৌদ্ধধর্মাবলম্বীদের মতে, ফানুস ওড়ানোর উদ্দেশ্য হলো আকাশে ভাসমান গৌতমের পবিত্র কেশধাতুকে প্রদীপ দিয়ে বন্দনা করা। প্রবারণা পূর্ণিমা যাকে বৌদ্ধরা বড় ছাদাং বলে, এ উদযাপনের সময় বৌদ্ধধর্মাবলম্বীরা ভিক্ষুদের কাছে ক্ষমাপ্রার্থনা করেন এবং বিশ্বাস করেন এর মাধ্যমে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও গৃহীদের পাপমোচন হয়। আষাঢ়ী পূর্ণিমা থেকে আশ্বিনী পূর্ণিমা তিথি এ তিন মাসের বর্ষাবাস শেষে প্রবারণা উৎসব পালন করা হয়। তাদের ধারণা, প্রবারণা হলো আত্মশুদ্ধি ও অশুভকে বর্জন করে সত্য ও সুন্দরকে বরণের অনুষ্ঠান। বুঝলি গরু?

আসলাম সাহেব মনে মনে ভাবলেন, তো আমরা এটা উড়াই কেন? না আমরা চীনা, না বৌদ্ধ, না হিন্দু! এতো টাকার অপচয় ছাড়া কিছু না।

– কিরে হুজুর? অপচয় ভাবছিস, তাই না?

এই হাফিজটা এত চালাক কেন? খপ করে চিন্তা ধরে বসে, মনে মনে নাখোশ আসলাম সাহেব। শুনতে থাকেন,

– অপচয়ের দেখেছিসটা কিরে? গত ১ নভেম্বর, ব্রিটেনে ট্রেনের ওভারহেড তারে জড়িয়ে বিপদ ডেকে আনে এক ফানুস। পরিষেবা ব্যাহত হওয়ায় ভোগান্তি হয় যাত্রীদের। এর আগে, ২০১৩ এর জুলাই মাসে ইংল্যান্ডের এক প্লাস্টিক রিসাইক্লিং কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড ঘটে ফানুসের কল্যাণে। পরে সেই আগুন ছড়ায় লাগোয়া শস্যক্ষেতেও। মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় ষাট লক্ষ পাউন্ড!

শুধু অগ্নিকাণ্ডই নয়, শখের ফানুসে ধাক্কা লেগে বিপর্যস্ত হয়েছে যাত্রীবিমানও। অনেকে আবার রাতের আকাশে ফানুসকে UFO ঠাউরে থানা-পুলিশ করেছেন নাওয়া-খাওয়া ভুলে। এ কারণেই ফানুসের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দুনিয়ার বহু দেশ। এমনকি এই বছর দিওয়ালীর সময় ভারতেও ফানুস উড়ানোর উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে পুলিশ।

– হুম, তাহলে আমরা করি কেন? এগুলো না করলেই তো হয়।
– আরে কি বলস রে পাগলা, তুই তো মান্ধাত্তার আমলেই রয়ে গেলি। একটু বিজ্ঞানমনস্ক হ। হো হো করে হেসে উঠলেন হাফিজ সাহেব। শোনরে বন্ধু, মানুষ এক আল্লাহকে ভুলে পৌত্তলিক চেতনা আঁকড়ে ধরেছে। বছরের শুরু ভালো কাটাও, আনন্দে কাটাও বাকি বছর আনন্দে যাবে। এটা বিজ্ঞানমনস্কতা বুঝলি?

– হুম। ধন্যবাদ বন্ধুবর। অনেক কিছু জানলাম। রাখি তাহলে।
– এই শোন শোন, কাল কি বার জানিস?
– হুম, সোমবার। কেন?
– নতুন বছর উদযাপন করবি না? রোজা রেখে করা যায় নাকি? নবী (ﷺ) বলেছিলেন, যে ব্যক্তি কোন কওমকে অনুসরণ করবে সে তাদের অন্তর্ভুক্ত। চল, তাহলে একটা কওমের মধ্যে ঢুকে পড়ি। সোমবারের রোজা, কি, রাজি?
– সেহরির সময় ডেকে দিস। ইফতারের দাওয়াত, বাসায় আসবি সন্ধ্যায়।
– যাহ শালা! তোর ঐ পোতানো ছোলা-মুড়ি খাওয়ার জন্য? আমার বয়েই গেছে। রাখ ফোন।

আসলাম সাহেব জানেন, হাফিজ আসবে। ও ওই পোতানো মুড়িই খাবে। কত রোজা গেছে ওর সাথে পোতানো মুড়ি খেয়ে। কালকেরটাও মন্দ যাবে না।

You have already voted.

You may also like

Post A Comment

Your email address will not be published.