Atheism

স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাস কী সহজাত? [Is Believe in GOD natural?]

By

স্রষ্টার অস্তিত্ব মানব মননের ইতিহাসের এক অন্যতম জিজ্ঞাসা। জীবনের উদ্দেশ্য, অর্থ প্রভৃতির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে পরম স্রষ্টার অস্তিত্বের প্রশ্ন। মানবের জ্ঞানার্জনের পদ্ধতি যেমন দর্শন বা বিজ্ঞান কোনোটি স্রষ্টার অস্তিত্বের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দিতে পারে না। বিজ্ঞান বা দর্শন দিয়ে এটাই প্রমাণ করা সম্ভব নয় যে, আমাদের চোখের সামনে থাকা এই বিশ্বজগতের আসলেই অস্তিত্ব আছে, আমরা কেউ হ্যালুসিনেশানের ঘোরে নেই। কিন্তু এরপরও আমরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি বিশ্বজগতের অস্তিত্ব আসলেই রয়েছে। একে বলা হয় self evident thruth। স্রষ্টার অস্তিত্বে বিশ্বাসও অনুরূপ বুনিয়াদি ও মৌলিক বিশ্বাস। অন্যদিকে স্রষ্টার অস্তিত্বকে অস্বীকার করার অর্থ হল, এই বিশ্বজগৎ যে প্রকৃত অস্তিত্বশীল এবং আমরাও যে বাস্তবিক অস্তিত্বে বিরাজমান তা অস্বীকার করা। এই বিশ্বাসও কিন্তু হাওয়া থেকে আনা নয়। প্রথমত এই বিশ্বাস হলো ইসলামি ধর্মমতের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইসলামি চিন্তাধারায় একে বলা হয় “ফিতরাহ্” – সহজাত প্রবৃত্তি যা দিয়ে মহান আল্লাহ্‌ আমাদের সৃষ্টি করেছেন। এটি হল স্রষ্টার অস্তিত্বের এক প্রাকৃতিক, সহজাত অনুভূতি। আমরা জানি আল্লাহ্‌র অস্তিত্ব রয়েছে। সেই সাথে এই ঐশ্বরিক সত্তাকে উপাসনা করার এক সহজাত আকুলতাও অনুভব করি মনের কোণে।

আমরা যদি বিভিন্ন সমাজ, সম্প্রদায় ও সভ্যতার ইতিহাস অনুসন্ধান করি তাহলে দেখতে পাবো ইতিহাসে কখনই এমন হয় নি যে, কোন সভ্যতা বা সম্প্রদায়ের সকলে মিলে স্রষ্টার অস্তিত্ব অস্বীকার করে বসেছে। ইতিহাস সাক্ষী যে, সকল সভ্যতাই ঐশ্বরিক সত্তার উপাসনা করেছে। আর অবাক করার মত ব্যাপার হল, মুহাম্মাদ (ﷺ) প্রায় ১৪৫০ বছর আগে বলে গেছেন, প্রত্যেক শিশুই “ফিতরাহ্”-এর উপর জন্মায়। (1)

তাছাড়া আল-কুর্‌আনেও এর সমর্থন রয়েছে। আল্লাহ্‌ (সুবহানাহু ওয়া তা’আলা) বলেন,

“তুমি একনিষ্ঠ হয়ে নিজেকে দ্বীনে প্রতিষ্ঠিত কর। আল্লাহ্‌র প্রকৃতি (ফিতরাহ্‌)-এর অনুসরণ কর, যে প্রকৃতি অনুযায়ী তিনি মানুষ সৃষ্টি করেছেন; আল্লাহ্‌র সৃষ্টির কোন পরিবর্তন নেই, এটা সরল দ্বীন; কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” (ভাবার্থ, মহিমান্বিত কুর্‌আন, সূরা রুম ৩০:৩০)

আল্লাহ্‌ প্রতিটি মানুষকেই ফিতরাহ্‌-এর উপর সৃষ্টি করেছেন। এখন দেখা যাক, আধুনিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাতে এর সমর্থনে পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ আছে কিনা? অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেভলোপমেন্টাল সাইকোলজিস্ট ড. জাস্টিন এল. ব্যারেট শিশুদের উপর গবেষণা করেন। এ ব্যাপারে বেশ কিছু বইও লিখেছেন তিনি। বইগুলোর মাঝে একটি হল “বর্ন বিলিভার্‌স”, যেখানে তিনি সুস্পষ্ট ভাষায় উল্লেখ করেছেন, “… শিশুরা জন্মগতভাবে বিশ্বাসী, যাকে আমি বলি ‘সহজাত ধর্ম’ …” (2)

অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী (নাস্তিক) ড. অলিভেরা প্যাট্রোভিচ Peer Reviewed জার্নালে তাঁর গবেষণার ফল জানান,

“কিছু ধর্মীয় বিশ্বাস যে সার্বজনীন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে (যেমন কোন বিমূর্ত সত্তাকে বিশ্বজগতের স্রষ্টা হিসেবে মৌলিক বিশ্বাস), এর (স্বপক্ষে) শক্তিশালী প্রমাণ ধর্মগ্রন্থের বাণীর চেয়ে বরং (বৈজ্ঞানিক) গবেষণা থেকেই বেশি বেরিয়ে আসছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে।” (3)

ইনি হলেন একজন বিজ্ঞানী। তিনি নিজের বৈজ্ঞানিক গবেষণার ফলাফল দিয়ে প্রমাণ দেখিয়েছেন যে, মানুষ সহজাত ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে অদ্বিতীয়-সর্বোচ্চ এক বুদ্ধিমত্তায় বিশ্বাস গড়ে তোলে। তিনি আরো বলেছেন যে, ধর্মীয় গ্রন্থের চেয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষালব্ধ প্রমাণ দ্বারাই তা শক্তিশালীভাবে সমর্থিত হচ্ছে। কিন্তু তিনি যদি ইসলামি ধর্মমত অধ্যয়ন করতেন তবে অবশ্যই জানতে পারতেন যে, ফিতরাহ্‌-এর এই ধারণা তথা আল্লাহ্‌র অস্তিত্বের প্রতি সহজাত বিশ্বাস ইসলামের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ। ইসলামি গ্রন্থগুলোর পাতার পর পাতা জুড়ে এর উপস্থিতি। একে অস্বীকার করার কোনই উপায় নেই। এর শেকড় ইসলামি ধর্মমতে প্রোথিত। এদিকে ইয়েল ইউনিভার্সিটির আরেক (নাস্তিক) গবেষক পল ব্লুম Peer Reviewed গবেষণাপত্রে প্রমাণ দেখিয়েছেন ঐশ্বরিক সত্ত্বার পাশাপাশি মানুষের যে মন বলে কিছুর অস্তিত্ব আছে এ ধারণাও সহজাতভাবেই শিশুদের মাঝে উদ্ভূত হয়। (4)

সাম্প্রতিক কালে আরো অনেক সেক্যুলার গবেষকদের গবেষণায় প্রতীয়মান হচ্ছে, ধর্মবিশ্বাস প্রাথমিকভাবে ব্যক্তির ভেতর থেকেই উৎপত্তি হয়… যা মৌলিকভাবে মানব মনের এক অংশ…। (5) তাদের সংগৃহীত তথ্য থেকে নতুন তত্ত্ব বেরিয়ে আসছে। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি তত্ত্ব হল, Strong Naturalness Theory যা পূর্বের প্রভাবশালী Anthropomorphism Theory কে ছুঁড়ে ফেলেছে। Strong Naturalness Theory এর বক্তব্য হল, ধর্মবিশ্বাসের উদ্ভব স্বয়ংক্রিয় ও অভ্যন্তরীণ এবং তা প্রকৃতপক্ষে স্বত:স্ফূর্তভাবে শিশুদের মাঝে উদ্ভূত হয়…। (6)

কথা এখানেই শেষ নয়। এইতো কিছু দিন আগেই প্রায় দুই মিলিয়ন পাউন্ড ব্যয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন গবেষকের নেতৃত্বে পরিচালিত তিন বছরব্যাপী এক আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্পে ৫৭ জন গবেষক ২০টি দেশে ৪০টি ভিন্ন ভিন্ন গবেষণা পরিচালনা করেন। তাঁদের এই গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল স্রষ্টা ও পরকালের ধারণা কি পিতামাতা বা সমাজ কর্তৃক চাপিয়ে দেওয়ার ফল নাকি মানব প্রকৃতির মৌলিক অভিব্যক্তি তা খুঁজে বের করা। দীর্ঘ গবেষণার পর তাঁরা সিদ্ধান্তে উপনীত হন, স্রষ্টার পাশাপাশি মৃত্যু পরবর্তী জীবনে বিশ্বাসও মানুষের সহজাত প্রবণতার অন্তর্গত। (7)

তাহলে আমরা কী বুঝলাম? এখন পর্যন্ত আমার বক্তব্যের সারমর্ম হচ্ছে, আমাদের আল্লাহ্‌র অস্তিত্বে বিশ্বাস করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ হল এই বিশ্বাস ফিতরাহ্‌-এর অংশ, এই বিশ্বাস সহজাত-প্রাকৃতিক। বিশ্বজগতকে প্রকৃতই অস্তিত্বশীল বলে বিশ্বাস করা যেমন যৌক্তিক, আল্লাহর অস্তিত্বে আমাদের এই বিশ্বাসও সম্পূর্ণ যৌক্তিক।

বি:দ্র: লেখাটি আমার প্রথম গ্রন্থ “বিশ্বাসের যৌক্তিকতা” থেকে ঈষৎ পরিবর্তনসহ গৃহীত। ফিতরাহ বিষয়ে ও নাস্তিকতা যে অস্বাভাবিক অবস্থা এ নিয়ে বিস্তারিত লিখার চেষ্টা করেছি আমার ২য় একক গ্রন্থ “অবিশ্বাসী কাঠগড়ায়” বইতে (প্রকাশিতব্য)।

রেফারেন্স:

(1) বুখারী, আস-সহীহ, জানাযা অধ্যায়; খণ্ড ০২, হাদীছ ১২৭৫-১২৭৬ (ঢাকা, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ৫ম সংস্করণ এপ্রিল ২০০৪)

(2) Dr. Justine L. Barrett, Born Believers: The Science of Children’s Religious Belief; p. 136 (Simon and Schuster, Mar 20, 2012)

(3) Olivera Petrovich, Key psychological issues in the study of religion; Psihologija (2007), Volume 40, Issue 3, p. 360; Available at: https://doi.org/10.2298/PSI0703351P

(4) Paul Bloom, Religion is natural (2007), Journal of Developmental Science 10:1, p. 147-151. DOI: 10.1111/j.1467-7687.2007.00577.x

(5) Patrick McNamara Ph.D., Wesley J. Wildman (etd.), Science and the World’s Religions; vol. 02 (Persons and Groups), p. 206, 209 (Publisher ABC-CLIO , July 19, 2012)

(6) প্রাগুক্ত, p. 210; এ বিষয়ে স্বল্প দৈর্ঘ্যের প্রামাণ্য ভিডিও দেখুন: http://callingtotheone com/is-believe-in-god-natural

(7) University of Oxford. “Humans ‘predisposed’ to believe in gods and the afterlife.” ScienceDaily, 14 July 2011. Available at: http://www. sciencedaily.com/releases/2011/07/110714103828.html

 

You may also like

Post A Comment

Your email address will not be published.