Islam

ইসলাম কি তরবারি দ্বারা প্রচারিত হয়েছে ? [Was Islam Spread by Sword?]

By

আরব ভূখণ্ডে ইসলাম প্রতিষ্ঠিত হওয়ার প্রথম শতকের মাঝে এবং পরবর্তীতে মুসলিমদের ক্রমাগত রাজ্য জয়ের অভিযানে আরব সাম্রাজ্যের দ্রুত সম্প্রসারণের ফলে বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম প্রভাবশালী সাম্রাজ্য গড়ে উঠে। খ্রিস্টীয় ৭ম শতকে সভ্যতার কেন্দ্র থেকে দূরে মরুময় আরব অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে চলে আসা গোত্র ব্যবস্থা সংস্কার করে প্রথম বারের মত একটি ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন স্রষ্টার সর্বশেষ বার্তাবাহক মুহাম্মাদ (ﷺ)। ৬৩২ খৃষ্টাব্দে তার মৃত্যুর পর পরম স্রষ্টার আদেশ বাস্তবায়নে, (1) সুপথপ্রাপ্ত খলিফা ও উমাইয়্যা খিলাফত কালে স্রষ্টার ইচ্ছার নিকট জীবনের সকল ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ তথা ইসলামের আহ্বান ছড়িয়ে পড়ে চারিদিকে।

ইসলামি খিলাফত বিশ্বের ইতিহাসে অন্যতম বৃহৎ ঐক্যবদ্ধ রাষ্ট্রে পরিণত হয় যা তিন মহাদেশের উপর রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে। যার বিস্তৃতি হয় ১৩ লক্ষ বর্গকিলোমিটারের চেয়েও বেশী। একাদশ শতকের শেষে মুসলিম অধিকৃত এসকল ভূখণ্ডের অধিকাংশ মানুষ ইসলাম গ্রহণ করেন। (2) ইসলামি বিশ্বে জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির অসংখ্য আধুনিক কেন্দ্র গড়ে ওঠে, যা বিশ্বব্যাপী অসংখ্য দার্শনিক, বিজ্ঞানী, গণিতবিদ, চিকিৎসক, পর্যটক, ব্যবসায়ীদের এক মিলন মেলায় পরিণত হয়। যা পরবর্তী ইউরোপীয় রেনেসাঁর সূচনা বিন্দু স্থাপন করে (3)। ইসলামের কঠোর সমালোচক হওয়া সত্ত্বেও বিখ্যাত সাহিত্যিক এইচ.জি. ওয়েলস এ বাস্তবতা স্বীকার করে লিখেন,

“নবধারা ও সতেজ প্রাণশক্তিপূর্ণ আরব মেধা কল্যাণকর জ্ঞানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার কাজটি পালন করেছিল সুষ্ঠুভাবে, যে ধারা এক সময় গ্রীকরা শুরু করে ছেড়ে দিয়েছিল।… আজকের আধুনিক বিশ্ব, জ্ঞানের সেই আলো ও শক্তির উপহার ল্যাটিন সূত্রে লাভ করেনি, করেছে আরবদের মাধ্যমে।…তারা পশ্চিমের চেয়ে প্রায় এক শতাব্দি এগিয়ে থেকে মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে জ্ঞান চর্চার কেন্দ্র গড়ে তুলেছিল।… পূর্ব কিংবা পশ্চিম, চারিদিক থেকে শিক্ষার্থীরা এখানে এসে জড়ো হত।…আরব দর্শন পরবর্তীতে লক্ষণীয়ভাবে প্রভাবিত করেছিল পশ্চিম ইউরোপীয় চিন্তাধারাকে বিশেষত প্যারিস, অক্সফোর্ড ও উত্তর ইটালির বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে।…” (4)

যে বাস্তবতা নব্য নাস্তিকতাবাদের অন্যতম জনকও স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছে। (5) শল্যচিকিৎসক ও সামাজিক নৃতত্ত্ববিদ রবার্ট ব্রিফল্ট বলেন,

“পঞ্চাদশ শতক নয় বরং মরুবাসী ও স্পেনের অধিবাসী আরবদের দ্বারা সংস্কৃতির পুনর্জাগরণের প্রভাবে প্রকৃত রেনেসাঁ সংঘটিত হয়েছিল। ইটালি নয়, বরং (মুসলিম) স্পেনই ছিল ইউরোপের নবজাগরণের জন্মস্থান স্বরূপ… ” (6)

আধুনিক পুঁজিবাদের প্রতিষ্ঠাতা অ্যাডাম স্মিথ বলেন,

“… এটা প্রতীয়মান হয় যে সর্বপ্রথম খলিফাদের সাম্রাজ্যেই পৃথিবীর মানুষ এক প্রশান্তির স্বাদ আস্বাদন করেছিল যা বিজ্ঞানের উন্নতির জন্য প্রয়োজনীয় ছিল।… সেই প্রশান্তি যা তাদের কোমল, ন্যায়পরায়ণ ও ধর্মীয় শাসকবর্গ বিস্তৃত সাম্রাজ্যে ছড়িয়ে দিয়েছিল, তা প্রকৃতির সাথে সম্পর্কের নীতিমালা সম্পর্কে মানুষের কৌতুহলকে পুনরুজ্জীবিত করে তুলেছিল … ” (7)

রাষ্ট্রে ও ব্যক্তিজীবনে ইসলামের এই দ্রুত সম্প্রসারণের কারণ সম্পর্কে বিভিন্ন ব্যাখ্যা জন্ম নিয়েছে। মধ্যযুগের খ্রিস্টান যাজকদের সাথে সুর মিলিয়ে জার্মান প্রটেস্টান্ট ধর্মবিদ ও ঐতিহাসিক ফিলিপ স্কাফ বলেন,

“… মুহাম্মাদের ধর্ম পৃথিবীর বিস্তীর্ণ অংশ জয় করেছিল তরবারির জোরে… ইসলাম বিস্তারের চালিকা শক্তি ছিল অন্ধবিশ্বাস ও বর্বর অত্যাচার… ” (8)

তাদের এই দাবি কি সত্যি?

ইসলামের প্রসারের দুটি দিক রয়েছে – একটি সাম্রাজ্যের প্রসার, অপরটি ব্যক্তি জীবনে ইসলামের বিস্তার। ঐতিহাসিক বাস্তবতার আলোকে আমরা বলতে পারি ইসলামি সাম্রাজ্য তথা রাষ্ট্রের প্রসার হয়েছে শক্তি অর্থাৎ তরবারির জোরেই! ইবনুল কাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন :

“আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা এই দীন ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন একদিকে দলীল প্রমাণ সাক্ষ্য সহকারে, এবং অপরদিকে তরবারী ও বর্শা দিয়ে, উভয়ে এমনভাবে একত্রিত আছে যার একটি থেকে অপরটি আলাদা করা যায় না।” (9)

অবাক হচ্ছেন? চলুন একটু পেছনে ফেরা যাক। মানব ইতিহাসের একটি পরিচিত নাম প্রাচীন গ্রীসের মেসিডোনিয়ার অধিপতি আলেক্সান্ডার দি গ্রেট যিনি অল্প সময়ের মাঝে বল্কান থেকে আজকের পাকিস্তান পর্যন্ত বিশাল সাম্রাজ্য গড়ে তোলেন সামরিক শক্তি ও কৌশল দ্বারা। (10) প্রশ্নবিদ্ধ চরিত্র নিয়ে রক্তের বন্যার উপর সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার পরও সেনানায়ক হিসেবে অসামান্য সফলতার কারনে তিনি উপাধি পেয়েছেন “দি গ্রেট”! (11) অথচ ইসলামি সাম্রাজ্যের দ্রুত বিস্তৃতিকে একই সুর ধরে “খিলাফত বা ইসলাম দি গ্রেট” না বলে সমালোচনার সম্মুখীন করা হল। কেন এই দ্বিমুখীতা! ঐতিহাসিক ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন,

“… ক্রুসেডের সময় থেকেই পশ্চিমা খ্রিস্টান জগতের মানুষ ইসলামের এক অতিরঞ্জিত ও বিকৃত ভাবমূর্তি গড়ে তোলে, যেখানে ইসলামকে তারা সুশীল সভ্যতার প্রতিপক্ষ হিসেবে বিবেচনা করেছে … ক্রুসেডের সময় খ্রিস্টানরাই যেখানে মুসলিম বিশ্বের বিরুদ্ধে একের পর এক নৃশংস-বর্বরোচিত পবিত্র যুদ্ধের সূচনা করেছিল, তখন ইউরোপের শিক্ষিত পণ্ডিত-যাজকরাই ইসলামকে স্বভাবগতভাবে সহিংস ও অসহিষ্ণু ধর্মবিশ্বাস হিসেবে বর্ণনা করেছে যা কেবল তরবারির সাহায্যেই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিল। ইসলামের কল্পিত গোঁড়ামিপূর্ণ অসহিষ্ণুতার কিংবদন্তী পাশ্চাত্যের অন্যতম প্রচলিত ধারণায় পরিণত হয়েছে।…” (12)

অথচ ইতিহাস জানায় ক্রিস্টোফার কলাম্বাস ও তার বাহিনী জোরপূর্বক ক্রিস্টান ধর্ম প্রচারের চেষ্টায় (13) আমেরিকার আদিবাসীদের উপর নৃশংসতম গণহত্যা চালায় (14), তাদের দাসে পরিণত করে ও তাদের সম্পদ হরণ করে (15)। যারা আজও পর্যন্ত আমেরিকার অন্যতম নির্যাতিত সম্প্রদায়। অথচ এরপরও প্রতি বছর অক্টোবরে আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে কলাম্বাস ডে পালিত হয় ! পরবর্তীতে নৃশংস ক্রুসেড যুদ্ধে তারা ধর্মের নামে নির্মমভাবে হত্যা করে অসংখ্য মানুষকে। (16) যে ক্রুসেড চলে এসেছে সাম্প্রতিক সময় পর্যন্ত। (17)

আফ্রিকার কঙ্গো দখলকারী খ্রিস্টান রাজা লিওপোল্ড ২ এর শাসনকালে (১৮৮৫-১৯০৮) প্রায় ছয় মিলিয়নের অধিক মানুষ হত্যা করা হয়, যার ইতিহাস খুব অল্প মানুষই জানে। (18) অথচ তারা দাবী করে ইসলাম কেবলই তরবারির দ্বারা প্রচারিত হয়েছে?

মুসলিমরা ইসলামের এই দ্রুত বিস্তৃতিকে পরম স্রষ্টার ঐশ্বরিক সাহায্যের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করেন। যার স্বপক্ষে এমনকি তৎকালীন খ্রিস্টান পণ্ডিতও মত দিয়েছেন। জন বার পেনকায়ি নামক নেস্টরীয় যাজক লিখেন,

“ ঐশ্বরিক সাহায্য ব্যতীত কীভাবে সাধাসিধা মানুষগুলো যারা বর্ম বা ঢাল ছাড়াই চড়ে বেড়াত তারা (এরূপ) জয় লাভ করতে পারে … ” (19)

সেক্যুলার গবেষকদের দৃষ্টিতে, ইসলামের আবির্ভাব বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছিল আদর্শিক ভিত্তি ও আরবভূমির রাজনৈতিক গঠনে যার ফলাফল এই ব্যাপক বিস্তৃতি। (20)

মুসলিমদের রাজ্যজয়ের প্রেরণা ছিল মহান স্রষ্টা নির্দেশিত আইন বাস্তবায়নের দ্বারা অন্য সকল মানব রচিত শাসন ব্যবস্থার নিষ্পেষণ থেকে মনুষ্যত্বকে রক্ষা করা। অভিযানকালে মুসলিমরা ইসলাম গ্রহণ, পরম স্রষ্টার আইনের কাছে আত্মসমর্পন ও জিযিয়া (নিরাপত্তা কর) প্রদান বা যুদ্ধ যে কোনটি বেছে নেয়ার সুযোগ দিত। তাই, জোরপূর্বক ধর্মান্তর মুসলিমদের সংগ্রামের উদ্দেশ্য ছিল না বরং উদ্দেশ্য ছিল অত্যাচারী স্বৈরশাসকদের সরিয়ে ইসলামের কর্তৃত্ব প্রতিষ্টা করা যাতে করে জনসাধারণ ইসলামের বাণী শুনতে পারে এবং ঐচ্ছিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ঐতিহাসিক মার্শাল হজসন বলেন,

“কুরআনের শিক্ষায় বিদ্যমান আদর্শিক ও অর্থনৈতিক সংহতি সাম্রাজ্য বিস্তারের ভিত্তিতে পরিণত হয়।… প্রধানত অনারব আবাদি এলাকায় আধিপত্য প্রতিষ্ঠাই লক্ষ্য ছিল, ধর্মান্তর নয়… ধর্ম হিসেবে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব, তাই সামাজিক সুশৃঙ্খলা আনয়নে মুসলিম শাসনই প্রয়োজন : প্রয়োজন সরল, ন্যায়পরায়ণ মুসলিমরা – পুরনো দুর্নীতিগ্রস্থ জনগণের সুবিধাভোগী ও অত্যাচারী প্রতিনিধিদের বদলে
দিবে… ” (21)

ইতিহাস সাক্ষী হয়ে আছে, মুসলিম সেনাবাহিনী সিরিয়া, মিশর, স্পেন, পারসিয়া ও সিন্ধু -এর জনগণকে মুক্ত করেছিল অত্যাচারী শাসন ও ধর্মের কবল থেকে। মুসলমানদের সহিষ্ণুতার কারনেই টিকে ছিল অনেক ক্ষুদ্র ধর্মীয় গোষ্ঠী । এর কিছু ঐতিহাসিক প্রমাণ নিচে দেয়া হল:

মুসলিমরা ৭১১ খ্রিস্টাব্দে যখন স্পেনে পৌঁছায় যখন ইহুদীরাই ছিল সর্বপ্রথমে তাদের স্রষ্টা প্রেরিত ত্রাণকর্তা হিসেবে স্বাগতম জানাতে। আমেরিকান ইহুদী ঐতিহাসিক জিওন জোহার লিখেন : “এভাবেই, ৭১১ খ্রিস্টাব্দে যখন মুসলিমরা কষ্টসাধ্য জিব্রালটার অতিক্রম করে উত্তর আফ্রিকা থেকে এসে ইবেরিয় উপদ্বীপ আক্রমণ করে, ইহুদীরা তাদের স্বাগতম জানিয়েছিল খ্রিস্টানদের নিপীড়ন থেকে রক্ষাকারী হিসেবে। ” (22)

মুসলিম অধিকৃত (পারস্যের) সাসানিদ সাম্রাজ্যের কিয়দংশে বাসকারী খুরাসানের নেস্টরিয় গোত্রের গোত্রপতি ইশোয়াব ৩ পারস্যের প্রধান পুরোহিতকে লেখা চিঠিতে জানান, “… এবং আরবেরা যাদের হাতে স্রষ্টা এখন বিশ্বের সাম্রাজ্য অর্পণ করেছেন, শোন, তারা এখন তোমাদের মাঝে,… তারা খ্রিষ্টীয় বিশ্বাসকে আক্রমণ করে না বরং… আমাদের যাজক ও স্রষ্টার সাধকদের সম্মান করে এবং আমাদের চার্চ ও সন্ন্যাসীদের আশ্রমের কল্যাণ সাধন করে। “(23)

“ আক্রমণকারী আরবদের দ্রুত সফলতা (অর্জনের) একটা বড় কারণ ছিল তারা স্থানীয় খ্রিস্টান অধিবাসীদের দ্বারা স্বাদরে অভ্যর্থিত হয়েছিল। খ্রিস্টানরা বাইজেন্টাইন শাসনকে শুধু তাদের অত্যাচারী শাসনের জন্যি ঘৃণা করত না, বরং প্রধানত ঘৃণা করত তাদের ধর্মীয় বিদ্বেষের কারণে… মুসলিমদের বিজয় মিসরের জ্যাকোবাইট খ্রিস্টান যাদের কপ্ট বলা হত-তাদের ধর্মীয় জীবনে স্বাধীনতা নিয়ে এসেছিল যা তারা প্রায় শত বছর আস্বাদন করে নি… ” (24)

“ রোমান সৈন্যরা তাদের অভিযানের পথে যে অপরাধ করেছে তা ভাষায় প্রকাশ করার মত নয়,… আরবরা যখন তাদের উচ্ছ্বসিত মহা বিজয়ের পর দামেস্কে ফিরে আসে, দামেস্কের অধিবাসীরা শহরের বাইরে থেকে তাদের সম্ভাষণ জানায় এবং সাদরে তাদের শহরে নিয়ে আসে, সকল চুক্তি ও নিরাপত্তা আবার অনুমোদিত হয় “(25)

“… আরবদের অবাধ সহনশীলতা অবশ্যই বিবেচনার দাবি রাখে। ধর্মীয় ব্যাপারে তারা কাউকে কোন প্রকার জোর প্রয়োগ করত না।… খ্রিস্টানরা ফ্রাংকদের চেয়ে তাদের শাসন পছন্দ করত…” (26)

রাজনীতিবীদ ও দার্শনিক মানবেন্দ্রনাথ রায় বলেন, “…ব্রাহ্মণ্য গোঁড়ামি বৌদ্ধ বিপ্লবের কণ্ঠরোধ করায় প্রচলিত ধর্মবিরোধী অগণিত মানুষ একাদশ ও দ্বাদশ শতাব্দীতে ভারতবর্ষে আশ্রয়হীন নির্যাতিতের মত দিশেহারা হয়ে পড়েছিল। তারাই ইসলামের বাণীকে সাগ্রহে স্বাগত জানিয়েছিল। ব্রাহ্মণ শাসকদের নিপীড়নে পীড়িত জাঠ ও অন্যান্য কৃষিজীবীদের সক্রিয় সহযোগীতায় মোহাম্মদ ইবন কাশিম সিন্ধু জয় করেন।… “(27)

“ ৭১২ সালে, আরব অধিনায়ক মুহাম্মাদ বিন কাসিম সিন্ধু জয় করেন এবং মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠা করেন; শুরুর দিকে (ইসলামে) ধর্মান্তরিতদের মাঝে অধিকাংশই ছিল নিম্ন বর্ণের হিন্দুরা যারা হিন্দু ধর্ম ত্যাগ করেছিল এই বিশ্বাসে যে ইসলাম তাদের সমঅধিকার দিয়েছে …” (28)

ঐতিহাসিক সুরজিৎ দাশগুপ্ত লিখেন, “… ঔরঙ্গজেব… একজন খাঁটি সুন্নি মুসলিম হিসেবেই তিনি মদ, ভাঙ ইত্যাদি নেশা নিষিদ্ধ করেছিলেন, বাইজিদের উপর হুকুমজারি করেছিলেন যে বিয়ে না করলে দেশ ছাড়তে হবে, অশ্লীল আমোদ-হুল্লোর বন্ধ করেছিলেন, সতীদাহ প্রথাও নিষিদ্ধ করেছিলেন।… ঔরঙ্গজেবের প্রতি আর একটা বড় অভিযোগ এই যে তিনি হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছেন। এটা সত্য যে তিনি একাধিক হিন্দু মন্দির ধ্বংস করেছিলেন, কিন্তু তার সঙ্গে এটাও সত্য যে তিনি একাধিক হিন্দু মন্দির নির্মানের জন্য অথবা পূর্বে নির্মিত মন্দিরের বিগ্রহের সেবা ও ভোগের জন্য জাগির দানের ফরমান জারি করেছিলেন। বারানসীতে তিনি এক শিবমন্দির ধ্বংস করেছিলেন এটা সর্বজনবিদিত কিন্তু এই বারনসীতেই তিনি যে জঙ্গমবাদী মঠের জন্য অর্থ ও ভূমি দান করেছিলেন তা গবেষক সমাজের বাইরে অজ্ঞাত।…এটাও বলে রাখা ভালো যে বিরুদ্ধ বা শত্রুপক্ষের উপর বিজয়ের চরম ঘোষণা হিসেবে সেই বিজিত এলাকার মন্দির বা মসজিদ ধ্বংস করা সে আমলে একটা প্রথা ছিল – সে প্রথা মেনেই মহারাস্ট্রীয়রাও বিজিতের ধর্মস্থান ধ্বংস করেছে এবং ঔরঙ্গজেবও গোলকোন্ডার তানাশাহর মসজিদ ধ্বংস করেছেন।…” (29)

অথচ আজকের সেক্যুলার ও তথাকথিত সভ্যতার দাবীদাররা ক্ষমতা ও রাজত্ব প্রতিষ্ঠার মোহে চালিয়ে যাচ্ছে ধ্বংসযজ্ঞ, হত্যা করছে কোটি কোটি মানুষকে, ক্ষুন্ন করছে ধর্মীয় স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক সাম্য। মাইকেল বোনার বলেন,

“ শুরুতেই বলতে হয়, কোন জোরপূর্বক ধর্মান্তর করা হয় নি, “ইসলাম গ্রহন এবং তরবারি” (যে কোন) একটিকে বেছে নেয়ার কোন ব্যাপার ছিল না। কুরআনের সুস্পষ্ট মূলনীতি ভিত্তিক ইসলামি বিধান এরূপ নিষিদ্ধ করেছে: জিম্মিদের অবশ্যই তাদের ধর্ম পালন করতে দিতে হবে। … যদিও ইসলামের ইতিহাসে জোরপূর্বক ধর্মান্তরের কিছু নজির আছে, এগুলো ছিল নিয়ম বহির্ভূত… ” (30)

ভারতবর্ষে ইসলামের প্রসার সম্পর্কে ঐতিহাসিক সুরজিৎ দাশগুপ্ত লিখেন,

“… এটা একটি প্রচলিত ধারণা যে এক হাতে কোরান অন্য হাতে কৃপাণ নিয়ে ইসলাম ধর্ম প্রচার করা হয়েছে… মুসলিম রাজনৈতিক শক্তির প্রধান কেন্দ্র ছিল দিল্লী-আগ্রা অঞ্চল, কিন্তু উল্লিখিত বড় বড় শহরগুলো বাদ দিলে ওই সব কেন্দ্র সংলগ্ন অঞ্চলগুলোতে মুসলিমদের সংখ্যার চাইতে কেন্দ্রের থেকে বহু দূরবর্তী অঞ্চলগুলোতে… মুসলিমদের সংখ্যা… সমগ্র জনসংখ্যার মধ্যে একটা গুরুত্বপূর্ণ আকার ধারণ করেছে। মুসলিম শক্তির মূল কেন্দ্রের থেকে বহু দূরে অবস্থিত ওই সব অঞ্চলে ইসলামের ব্যাপক প্রচার কী করে এবং কেন হলো?… দীর্ঘকাল মুসলিম শাসনের অধিনে থাকা সত্ত্বেও ভারতবর্ষের অধিকাংশ অধিবাসী, এমনকি মুসলিম শক্তির প্রধান কেন্দ্রগুলির অধিবাসীও, হিন্দুই রয়ে যায়… মুসলমানরা যদি সত্যিই এক হাতে অস্ত্র নিয়ে ধর্মপ্রচারের অভিযানে নামত তাহলে ইউরোপের মত ভারতবর্ষেরও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের চিহ্নমাত্র থাকত না… এক হাতে কোরান অন্য হাতে কৃপানের তত্ত্ব… প্রযোজ্য হতো যদি ইসলাম ধর্মাবলম্বীরা বৈদিক আর্যদের আগ্রাসনের পরে… ইউরোপীয় খ্রিস্টানদের মত সন্ধিহীন ভাবে ধর্মপ্রচারের পন্থা গ্রহণ করত…” (31)

ঐতিহাসিক অধ্যাপক রেখা পাণ্ডে বলেন,

“যে ব্যাপারটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যা আমি এই দীর্ঘ ইতিহাসে আলোচনা করেছি তা হল, প্রায় আটশত বছর ব্যাপী মুসলিম শাসকদের ইন্ডিয়া শাসনকালে জোরপূর্বক ব্যাপক ধর্মান্তরের কোন ঘটনা ঘটেনি। আমাদের কাছে যথেষ্ট ঐতিহাসিক প্রমাণ রয়েছে যে জোরপূর্বক ধর্মান্তরের কোন ঘটনা ঘটেনি। (জোরপূর্বক ধর্মান্তরের ব্যাপারে) প্রস্তাবিত এ সকল মতের অধিকাংশই আধুনিক কালে প্রচারিত, যখন একটি পৃথক পাকিস্তানের দাবি উঠে, জাতীয়তাবাদের পক্ষে ও বিপক্ষে থাকা লেখকগণ যখন একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের জন্য যুদ্ধ করছিলেন- সাম্প্রদায়িকতার প্রসারে ইতিহাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ারে পরিণত হয়।… স্থিতিশীলতা এ সকল মুসলিম শাসকদের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আর এরূপ (জোরপূর্বক) ধর্মান্তর এই স্থিতিশীলতার পথে গুরুত্বপূর্ণ কোন পদক্ষেপ ছিল না। সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই তারা অধিক আগ্রহী ছিলেন।… তাই এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে, এ সকল শাসকগণ ইসলামি ভাবধারায় শাসনকালে জনসাধারণকে ধর্ম চাপিয়ে দেন নি। ধর্মান্তর যারা হয়েছিল তা ছিল মূলত ঐচ্ছিক।… কারণ আমাদের কাছে জোরপূর্বক ধর্মান্তরের তেমন কোন প্রমাণ নেই।…” (32)

দক্ষিণ এশিয়ার সংস্কৃতি ও বৌদ্ধিক ইতিহাসের স্বনামধন্য গবেষক অড্রে রুশেক (Audrey Truschke) নিজের গবেষণায় প্রমাণ করে দেখিয়েছেন মুসলিম শাসকরা কখনই ভারতীয় সংস্কৃতি বা হিন্দুত্ববাদের উপর আধিপত্য কায়েম করতে চাননি। বরং সে সময়ে ধর্ম ও ভাষার ক্ষেত্রে অসাধারণ সহাবস্থান স্থাপন করেছিল উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ। তার গবেষণা প্রকাশ করেছেন “Culture of Encounters: Sanskrit at the Mughal Court” নামক বইটিতে। সুপরিচিত স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এই গবেষক লিখেন, নিজেদের স্বার্থে নিজেদেরকে নিরপেক্ষ রক্ষাকর্তা দাবি করে ব্রিটিশ শাসকরা আসলে হিন্দু-মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মধ্যে বিভেদ তৈরি করতে চেয়েছে। প্রাচীনকাল থেকেই তারা একে অপরের শত্রু, এই ধরণের বিকৃত ইতিহাসকে প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছে। ঔপনিবেশিকতার অবশাসনের পরেও ডানপন্থী আধুনিক হিন্দুত্ববাদীরা রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে এই বিবাদকে জিইয়ে রাখতে চেয়েছেন। (33)

ইসলামের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামরিক, সামাজিক প্রবল বাধা সত্ত্বেও বর্তমানে সবচেয়ে দ্রুত বর্ধনশীল ধর্ম হল ইসলাম। তাদের কে বাধ্য করছে ইসলাম গ্রহনে ? পরিশেষে নেপোলিওনের অনুধাবন প্রতিধ্বনি করে বলতে হয়, “ আমি আশা করি, সে দিন বেশী দূরে নয় যেদিন সকল দেশের প্রাজ্ঞ ও শিক্ষিত মানুষদের আমি ঐক্যবদ্ধ করে একটি অভিন্ন শাসন প্রতিষ্ঠা করব যার ভিত্তি হবে আল-কুরআনের মূলনীতি, যা একমাত্র সত্য এবং যে নীতিই কেবল মানুষকে সুখের দিকে ধাবিত করতে পারে। ” (34)

[কিছু কথাঃ এই লেখাটি প্রথম callingtotheone ব্লগে প্রকাশিত হয়। এটার উপর তারা ভিডিও তৈরি করেন। এখানে কিছুটা পরিমার্জিত সংস্করণ দেওয়া হয়েছে।]

রেফারেন্স :

(1) আল-কুরআন, সূরা বাকারা ২:১৯৩

(2) Tobin Siebers, Religion and the Authority of the Past; p. 113-115 (University of Michigan Press, November 1, 1993)

(3) Michael Hamilton Morgan, Lost History – The Enduring Legacy of Muslim Scientists, Thinkers and Artists; p. XIV, XVI (Washington D.C., National Geographic Society, 1st paperback edition June 2008); আরও পড়ুন, George Saliba, Islamic Science and the Making of the European Renaissance (USA, MIT Press, 2007); Jim Al-Khalili, The House of Wisdom: How Arabic Science Saved Ancient Knowledge and Gave Us the Renaissance (Penguin Press, 2011)

(4) H.G. Wells, The Outline of History: Being a Plain History of Life and Mankind; vol. II, p. 335-336 (London, The Waverley Book Company, Limited, 1920)

(5) https://twitter.com/richarddawkins/status/678074638119882752?lang=en

(6)Robert Briffault, The Making of Humanity; p. 188 (London, George Allen & Unwin Ltd., 1st published 1919)

(7) Adam Smith, The Essays of Adam Smith, London, 1869, p. 353

(8) Philip Schaff, History of the Christian Church; vol. IV, chapter III, section § 40: Position of Mohammedanism in Church History (New York, Charles Scribner’s Sons, 3rd edition 1910) [online edition http://www.bible.ca/history/philip-schaff/4_ch03.htm)

(9) ইবনুল কাইয়িম, আল-ফারুসিয়াহ; পৃ ১৮ (Retrieved from https://islamqa.info/en/43087)

(10) http://www.livescience.com/39997-alexander-the-great.html

(11) Joseph Roisman, Ian Worthington (Editor), A Companion to Ancient Macedonia; p. 192 (John Wiley & Sons, Illustrated Edition 2010)

(12) Karen Armstrong, Islam A Short History; p. 180 (New York, The Modern Library, Paperback Edition 2002)

(13) E.G. Bourne & Julius E. Olson (Ed.), The Northmen, Columbus and Cabot, 985-1503: The voyages of the Northmen, The voyages of Columbus and of John Cabot; p. 90 (New York, Charles Scribner’s Sons., 1906)

(14) “… The worst human holocaust the world had ever witnessed, roaring across two continents non-stop for four centuries and consuming the lives of countless tens of millions of people, finally had leveled off. There was, at last, almost no one left to kill.”

David E. Stannard, American Holocaust: The Conquest of the New World; p. 146 (Oxford University Press, 1922) [Professor of American Studies at the University of Hawaii]; Bartolomé De Las Casas, A Short Account of The Destruction of The Indies (Penguin Group, London & New York, 1992)

(15) The voyages of the Northmen, Columbus and Cabot, 985-1503, p. 79; Howard Zinn, A People’s History of the United States; p. 02 (Longman Group UK Ltd., Fourth impression 1994)

(16) Albert of Aachen, Historia Ierosolimitana; p. 375, 429-433 (translated by Susan B. Edgington, Oxford, 2007); Elizabeth M. Hallam (edt.), Chronicles of the Crusades: Eye-witness Accounts of the Wars Between Christianity and Islam; p. 67, 86 (Welcome Rain Publisher, Illustrated edition, 2000)

(17) On December 11, 1917 the British General Edmund Allenby entered Jerusalem triumphantly through the Jaffa gate and declared that “the wars of the crusades are now complete”….The then Prime Minister David Lloyd George described the capture of Jerusalem as “a Christmas present for the British people”; he had advised Allenby to take the city before the Holidays.

http://www.aljazeera.com/indepth/opinion/2014/12/revisiting-british-conquest-je-2014121381243881138.html

“This crusade, this war on terrorism is gonna take a while…” – George W. Bush (Retrieved from https://georgewbush-whitehouse.archives.gov/news/releases/2001/09/20010916-2.htmlhttp://www.independent.co.uk/news/world/americas/as-america-mourned-the-impact-of-the-war-on-terror-was-felt-worldwide-415636.html)

(18) https://www.thegurdian.com/thegurdian/1999/may/13features11.g22

https://www.nytimes.com/books/98/08/30/daily/leopold-book-review.html

(19) John Bar Penkaye, quoted by W. E. Kaegi, Byzantium and the Early Islamic Conquest; p. 216 (Cambridge, 2000)
(20) Fred M. Donner, The Early Islamic Conquests; p. 08 (New Jersey, Princeton University Press, 2014)
(21) Marshall G. S. Hodgson, The Venture of Islam, vol. 1: The Classical Age of Islam, p. 199 (London, The University of Chicago Press, Ltd., Paperback edition 1977)
(22) Zion Zohar, Sephardic & Mizrahi Jewry; p. 8 – 9 (New York, 2005)
(23) Ishoyabh III quoted by T. W. Arnold, Preaching of Islam; p. 81 – 82 (London, 1913)
(24) T. W. Arnold, Preaching of Islam; chapter IV, p. 83 (London, Constable & Company Ltd., 2nd edition, 1913)
(25) Dionysius of Tel-Mahre, The Seventh Century in the West-Syrian Chronicles; p. 157 (Liverpool, 1993)
(26) Reinhart Dozy, A History of Muslims in Spain; p. 235 (1861, reprinted 1913, 2002, Delhi)
(27) M.N. Roy (Narendra Nath Bhattacharya), The Historical Role of Islam: An Essay on Islamic Culture; p. 95-96 (Bombay, Vora & Co. Publishers Ltd., 2nd Impression March, 1938)
(28) A. Ezzati, The Spread of Islam: The Contributing Factors; p. 06 (London, ICAS Press, 4th revised edition, 2002)
(29) সুরজিৎ দাশগুপ্ত, ভারতীয় মুসলমানদের সংকট ও সমস্যা; পৃ: ২৪-২৬ (ইতিহাস সংকলন, প্রণয়ন ও গবেষণা সংস্থা – জানুয়ারি, ২০০৮)
(30) Michael Bonner, Jihad in Islamic History; p. 89-90 (Princeton University Press, 2008)
(31) সুরজিৎ দাশগুপ্ত, ভারতবর্ষ ও ইসলাম; পৃ. ১৫-২০ (কলিকাতা, শঙ্কর প্রকাশন, ১ম প্রকাশ ১৯৬০)
(32) Professor Rekha Pande, Islam – Its Philosophy and Spread in India (lecture); retrieved from https://youtu.be/VdHi3jm7wFI; (Prof. Rekha Pande is the Head of Center for Women’s Studies Faculty, Dept. of History, University of Hyderabad)
(33) http://zeenews.india.com/bengali/world/hindu-religion-and-culture-were-safe-under-mughal-empire-in-india_131532.html (Audrey Truschke is assistant professor of South Asian history at Rutgers University–Newark and a Mellon Postdoctoral Fellow in the Department of Religious Studies at Stanford University)
(34) Christian Cherfils, Bonaparte et Islam; p. 125 (Paris, 1914); See also: J. Christopher Herold, Bonaparte in Egypt; p. 145 (London, 1962)

You may also like

Post A Comment

Your email address will not be published.