Physician | Author | Blogger

অ্যাকাডেমিক দৃষ্টিকোণে চরমপন্থা

এক নজরে

সন্ত্রাসবাদী হয়ে ওঠা অথবা তথাকথিত উগ্রপন্থায় পা বাড়ানোর পিছনে কারণ কি কি এবং এতে ধর্মের ভূমিকাই বা কতটুকু—এ নিয়ে পণ্ডিতদের মাঝে বিভিন্ন মতো পাওয়া যায়। তবে গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা এ ব্যাপারে একমত যে—জঙ্গিবাদের মূল কারণ ধর্ম নয়। ধর্মের চেয়ে বরং রাজনীতি বেশি প্রভাব রাখে। ১৯৮০ সাল থেকে শুরু করে বিশ্বের প্রতিটি আত্মঘাতী হামলার একটি তালিকা প্রণয়ন করেছেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী রবার্ট পেইপ। তালিকায় দেখা যায় ১৯৮০ থেকে ২০০৩ সালের মধ্যে যে সমস্ত আত্মঘাতী হামলা সংঘটিত হয়েছিল, তার ৯৫%-এর নেপথ্যে ইসলাম বা অন্য কোনো ধর্মের ভূমিকা ছিল না। মূলত ভিনদেশি সৈন্য কর্তৃক স্বীয় ভূমির দখলদারি ছিল এসকল হামলার আসল কারণ। আদমবোমারু (Suicide attackers) ও তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলি মূলত ভিনজাতি কর্তৃক দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে নিজেদের রাজনৈতিক চিন্তাধারা প্রতিষ্ঠার জোর চেষ্টা করে। তারা নিজেদের জমি থেকে গণতান্ত্রিক সরকারগুলিকে সরে যেতে বাধ্য করে জমির ওপর তাদের অধিকার ফিরে পেতে চায়।

আত্মঘাতী বোমা হামলাকারীরা মুসলিম হতে পারে, কিন্তু পেইপ-এর গবেষণায় দেখা গেছে যে আত্মঘাতী হামলার অর্ধেকটাই সেক্যুলার চিন্তাধারার লোকেরা করেছিল … ধর্মীয় হোক বা সেক্যুলার, তাদের সবারই লক্ষ্য থাকে দখলদারি বাহিনীকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা। … পেইপে মতে, এসব ক্ষেত্রে ধর্মের কিছু ভূমিকা থাকলেও তা ‘কখনোই মৌলিক কারণ না’। … অন্যান্য বিশেষজ্ঞরা রাজনৈতিক কারণ থেকে সামাজিক কারণগুলিকে বেশি দায়ী মনে করেন … এ ছাড়াও নাম-যশখ্যাতি, রোমাঞ্চের অনুভূতি, সহকর্মীদের কাছ থেকে গ্রহণযোগ্যতা—এসব কারণও ভূমিকা রাখে। ধর্মের কোনো ভূমিকা নেই তা বলছি না, কিন্তু সেটা অনুঘটক হিসাবে নয় … জঙ্গিরা কি করে এবং কেন করে তা বোঝার চাবিকাঠি হলো মূলত রাজনৈতিক এবং সামাজিক কারণগুলি। …

৯/১১ এর পর থেকে ‘টেররিস্ট’ শব্দ শুনলেই আমাদের মানসপটে কোনো মুসলিমের চেহারা ভেসে উঠে৷ সিএনএন বা বিবিসি-তে কোনো সন্ত্রাসী হামলার ব্রেকিং নিউজ শোনার সাথে সাথে অনেকেই ভেবে বসেন—নিশ্চয় কোনো মুসলিম এই আকাজ ঘটিয়েছে। সন্ত্রাসী কর্মকান্ডগুলো শুধু মুসলিমরাই করে বেড়ায় এমনটাই সবাই ভাবে। কিন্তু বাস্তবতা তা নয়। কারণ দীর্ঘ সময়ের বিচারে এহেন দাবি ধোপে টিকে না। আমেরিকা ও ইউরোপে ঘটা সন্ত্রাসী হামলাগুলোর তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে যে বাস্তবতা জানা গেছে সেটা আমরাই প্রায় কেউই জানি না বা স্বীকার করি না, আর তা হলো—অধিকাংশ সন্ত্রাসী হামলা ঘটিয়েছে অমুসলিমরা। এফবিআই এর হিসেব মতে, ১৯৮০ থেকে ২০০৫ পর্যন্ত আমেরিকার মাটিতে ঘটা সন্ত্রাসী হামলাগুলোর ৯৪% ঘটিয়েছে অমুসলিমরা। আমাদের মনে রাখতে হবে ৯/১১/২০০১ এর ঘটনাও কিন্তু এই হিসেবের মধ্যে শামিল। যদিও এই ব্যাপারগুলো আরো ঘোরালো, স্রেফ মাথাগুনে সমাধান হবেই এমন না। এসকল হামলার খুব ক্ষুদ্র অংশের জন্য মুসলিমরা দায়ি। তবে বড় মাপের ক্ষতির জন্য যে বেশি লোকের দরকার হয় তা না, ৯/১১ এর ঘটনাই দেখুন না।

তবে একই অভিযোগ কিন্তু অমুসলিমদের জন্যও খাটে। যেমন ১৯৯৫ সালে ওকলাহোমা শহরের প্রশাসনিক ভবনে টিমোথি ম্যাকভেই হামলা চালিয়ে বহু লোককে হত্যা করে। আমেরিকাতে সংঘটিত সহিংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাগুলোকে ঘাঁটলে আমরা দেখতে পাই—চরমপন্থি মুসলিমরা এসবের মূল হোতা নয়। ট্রায়াঙ্গেল সেন্টার অন টেররিজম এন্ড হোমল্যান্ড সিকিউরিটি’র তথ্য অনুযায়ী ৯/১১ এরপর থেকে নিয়ে ২০১৫ সাল পর্যন্ত ৬৯ জন লোক চরমপন্থি মুসলিমদের হাতে নিহত হয়েছে। অথচ একই সময়ে অন্যদের দ্বারা দুই লাখ বিশ হাজারেরও বেশি আমেরিকান নিহত হয়েছে। এইদুয়ের তুলনায় বোঝা যায় মুসলিমদের হাতে নিহতের সংখ্যা অন্যদের তুলনায় কতটা অপ্রতুল।

আলাদাবইওয়াফিলাইফরকমারিবইটই (ই-বুক)

ট্রায়াংগেল সেন্টার আরো খেয়াল করেছে যে—স্রেফ ২০১৫ সালে ১৩৪ জন আমেরিকান মাস-শুটিংয়ে নিহত হয়েছে। এর অর্থ হলো কেবল এক বছরের অমুসলিমদের দ্বারা মাস-শুটিংয়ে যত লোক নিহত হয়েছে তা চৌদ্দ বছর ধরে চরমপন্থি মুসলিমদের দ্বারা নিহতের সংখ্যার প্রায় দ্বিগুন! অথচ তারপরও মাস-শ্যুটিংয়ের ঘটনাগুলো রাজনীতি-ব্যবসায়ীদের কাছে ততটা মনোযোগ পায় না, মাথাব্যাথারও কারণ হয় না। সন্ত্রাসী হামলার পিছে সবসময় মুসলিম খুঁজতে থাকার মানসিকতার কারণে শ্বেত-সন্ত্রাসীদের হামলাগুলো ধামাচাপা পড়ে যায়।

আরো অবাক করার মতো ব্যাপার আছে।

আমরা যদি মাস-শুটিং বা হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাগুলিকে বাদ দিয়ে শুধু জঙ্গিহামলার ঘটনাগুলোকে তালাশ করি তা হলে খুঁজে পাই—এক্ষেত্রেও চরমপন্থি মুসলিমরা প্রধান হুমকি নয়। আমেরিকার সামরিক অ্যাকাডেমি’র কম্ব্যাটিং টেররিজম সেন্টার (CTC) এর তথ্যমতে, জঙ্গিবাদী হামলার পিছে প্রধান হুমকি হলো ডানপন্থি সন্ত্রাসীরা (right-wing extremists)। ৯/১১ এর পরের দশকগুলোতে ডানপন্থি সন্ত্রাসীরা ৩৩৭টি হামলা চালিয়েছে আর হত্যা করেছে ২৫৪ জনকে। দেখা যাচ্ছে ৯/১১’র পর থেকে গড়পড়তা মুসলিম চরমপন্থির তুলনায় ডানপন্থি সন্ত্রাসীরা অনেক বেশি খতরনাক। তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকেও স্বীকার করতে দেখা যায়—জঙ্গিবাদী হামলার পিছে মুসলিম চরমপন্থিরা মূল ঝুঁকি নয়। … সরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সদস্য ক্লেয়ার ম্যাককাসকিল এক স্বীকারোক্তিতে বলেন, আমেরিকার জমিনে নিজেদের দ্বারা যেসব সন্ত্রাসী হামলা ঘটে সেগুলোর তুলনায় আইসিস-অনুপ্রাণীত হামলাতেই বেশি মনোযোগ দেয় এফবিআই আর আমেরিকার সরকার। কিন্তু শ্বেত-সন্ত্রাস আর সরকারবিরোধী হামলা ঘটেছে আইসিস-এর সাথে জড়িত হামলার চেয়ে তিনগুণ বেশি। অথচ এরপরও শ্বেত-সন্ত্রাসী হামলাগুলো খুব অল্পই আলোচনায় আসে। আইসিস-এর হামলায় তড়িঘড়ি করে শুনানি হলেও, শ্বেত-সন্ত্রাসী হামলাগুলোর কোনো শুনানিই হয় না!

ক্লেয়ারের বক্তব্য থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়—কেন্দ্রীয় সরকার কেবল রাজনৈতিক কারণে শ্বেত-সন্ত্রাসী হামলাগুলোর চেয়ে আইসিস-এর ওপর বেশি মনোযোগ দেয়। মাঠপর্যায়ে ঘটা হামলার সাথে তাদের মানসিকতার সম্পর্ক নেই বললেই চলে।”


(Associate Professor) Todd H. Green, Presumed Guilty Why We Shouldn’t Ask Muslims to Condemn Terrorism; p. 6-12, 15-17 (Minneapolis: Fortress Press, 2018)। নির্বাচিত অনুবাদ: রাফান আহমেদ। অনুবাদটি সংকলিত হয়েছে ভাবনার মোহনায় (ঢাকা: মিনারাহ পাবলিকেশান, ২০২১) এ।

Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email
Related Articles
Recent Articles

রাফান আহমেদ-এর বইসমূহ

আলাদাবইওয়াফিলাইফ

Copyright © Rafan Ahmed

No part of the website or posts can be published elsewhere without prior permission from author.  

Copyright © 2021 All rights reserved

error: Content is protected !!