Physician | Author | Blogger

ভাষা আন্দোলন ও প্রগতিশীলদের দোটানা

এক নজরে

“রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন আমাদের জাতীয় ইতিহাসে একটি খুবই উল্লেখযোগ্য ঘটনা। অথচ আগে কেউ ভাবতে পারেনি যে, এরকম কোনো আন্দোলনের উদ্ভব এদেশে ঘটতে পারবে। ব্রিটিশ শাসনামলে যখন রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন উঠেছে তখন হিন্দুরা সাধারণভাবে বলেছেন, হিন্দি ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করবার কথা। অন্যদিকে মুসলমানরা বলেছেন, উর্দুকে ভাবি স্বাধীন ভারতের রাষ্ট্র ভাষা করবার কথা। রাষ্ট্রভাষার প্রশ্ন মূলত হয়ে উঠেছিল হিন্দি-উর্দুর দ্বন্দ্ব। এখানে ছিল না বাংলা ভাষার কোনো স্থান।

১৯৩৮ সালের ১ অক্টোবর All India Muslim Educational Conference এর সভাপতির ভাষণে ফজলুল হক সাহেব বলেন, হিন্দিকে নয় উর্দুকে করতে হবে ভারতের সাধারণ ভাষা (Lingua franca)। অন্যদিকে ১৯৪০ সালে নাগপুরে অনুষ্ঠিত হিন্দি সাহিত্য সম্মেলনে মোহনদাস করম চাঁদ গান্ধী (মহাত্মা গান্ধী) বলেন, মুসলমান রাজা-বাদশাহরা উর্দু ভাষার উন্নয়ন সাধন করেছেন। যদি মুসলমানরা চান উর্দু ভাষার উন্নয়ন, তবে, সে দায়িত্ব নিতে হবে মুসলমান সমাজকে, স্বাধীন ভারত রাষ্ট্রকে নয়।…

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন প্রথমে শুরু করেছিলেন ছাত্ররা। তাদের মনে একটি আশঙ্কা প্রবল হয়ে উঠেছিল, যদি উর্দুকেই একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করা হয় তবে উর্দু যাদের মাতৃভাষা অথবা হয়ে উঠেছে মাতৃভাষার মতো, উর্দু ভাষায় তারা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে সহজেই পেতে পারবেন উচ্চ সরকারি কর্ম। বাংলাভাষীরা হতে পারবেন না বড় সরকারি পদের অধিকারী। এ ছিল এই আন্দোলনের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক যুক্তি। প্রথমে এই আন্দোলন যদিও আরম্ভ হয় ছাত্র সমাজ কর্তৃক কিন্তু পরে তা হয়ে ওঠে গণআন্দোলন। তাই আন্দোলন পেতে পারে সাফল্য।…

রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে বিশেষভাবে নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন তমুদ্দন মজলিস নামে একটি সংগঠনের সদস্যরা। তমুদ্দন মজলিস গঠিত হয় ১ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭ সালে। এই প্রতিষ্ঠানটিকে আধুনিক পরিভাষায় বলা চলে ‘ইসলামপন্থি’ এবং হানাফী মাযহাবভুক্ত। হানাফিরা মনে করেন আরবী যাদের মাতৃভাষা নয় তারা নিজ ভাষায় আল্লাহর ইবাদত করতে পারেন। হানাফি মাযহাবভুক্ত মুসলমানরা সব দেশেই মাতৃভাষার উপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। কেবলই আরবী ভাষার উপর নয়। বাংলা ভাষা আন্দোলনে এই হানাফি মায়হাফভূক্ত ইসলামপন্থিরাই বিশেষভাবে দিতে চেয়েছিলেন নেতৃত্ব এবং দিয়েছিলেনও। এখন মহল বিশেষের পক্ষ থেকে রাজনৈতিক কারণে ঢেকে রাখার চেষ্টা করা হচ্ছে এই ঘটনাকে। বলা হচ্ছে বাংলা ভাষা আন্দোলন ছিল প্রথক স্বাধীন বাংলাদেশ গড়বার প্রথম পদক্ষেপ।

১৯৪৮ সাল থেকে ভাষা আন্দোলনের শুরু তবে ১৯৫২ সালে এসে এই আন্দোলন গ্রহণ করে একটি চূড়ান্ত রূপ। কিন্তু ভাষা আন্দোলনের সময় স্বাধীন বাংলাদেশ গড়বার কোনো ধারণা ছিল না। তমুদ্দন মজলিসের সদস্যরা আন্দোলন করেছিলেন সাবেক পাকিস্তানের মধ্যে বাংলা ভাষী মুসলমানদের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। সাবেক পাকিস্তানকে ভেঙে দেবার কোনো পরিকল্পনা তাদের ছিল না।

বামপন্থী ছাত্ররাও বাংলা ভাষা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। কিন্তু তারা ভুগছিলেন আদর্শিক গোলযোগে। এ সময় পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সৈয়দ সাজ্জাদ জহির। ডাকনাম ছিল, বাকি ভাই। বিরাট ভূ স্বামী পরিবারের সন্তান। বিলাতের অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রিপ্রাপ্ত; কিন্তু তখনি হন কমিউনিস্ট। তিনি ছিলেন ভারতের উত্তর প্রদেশের লোক। তার মাতৃভাষা ছিল বিশুদ্ধ উর্দু। তিনি ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান হবার পর আসেন করাচিতে। তিনি বলেন, উর্দুই হওয়া উচিত পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা। কেননা, মজদুররা করবেন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। মজদুররা বাংলা ভাষা বোঝেন না। কিন্তু উর্দু ভাষা বোঝেন। এই উপমহাদেশে মজদুরদের নিয়ে করতে হবে সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। কিন্তু বাংলাদেশের কমিউনিস্টদের একটি বিশেষ অংশ যোগ দেন বাংলা ভাষা আন্দোলনে। এক্ষেত্রে তারা সে সময়ের পাকিস্তানের কম্যুনিস্ট পার্টির সঙ্গে একমত হতে পারেননি।

অন্যদিকে এই উপমহাদেশে তখন কমিউনিস্টরা সাধারণভাবে বলছিলেন, “ইয়ে আজাদি ঝুট্টা হ্যায়, লাখো ইনসান ভুখা হ্যায়।” তারা বলছিলেন, বিদেশি ব্রিটিশ শাসনের অবসান ঘটেছে। কিন্তু তা বলে মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা আসেনি। কেননা, লক্ষ লক্ষ মানুষ এখনো আছে অভুক্ত হয়ে। কম্যুনিস্টরা এসময় ভারত ও পাকিস্তানজুড়ে একসঙ্গে করতে চাচ্ছিলেন সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব। তারা কার্যত পাকিস্তানকে একটা পৃথক রাষ্ট্র হিসাবে মানতে চাচ্ছিলেন না। যদিও তারা এক সময় পাকিস্তানের দাবিকে পুরাপুরিভাবে সমর্থন করেছিলেন। ভাষা আন্দোলনের সময় অনেক কমিউনিস্ট এমন কথাও মনে করেছিলেন যে, ভাষা আন্দোলনের উপর গুরুত্ব দিলে মানুষের ভাত কাপড়ের আন্দোলন ব্যাহত হবে। তাই ভাষা আন্দোলনের ক্ষেত্রে তাদের মনে সৃষ্টি হতে পেরেছিল যথেষ্ট বিভ্রান্তি। তারা ভাবছিলেন ভাষা আন্দোলন মূলত হলো শিক্ষিত বাংলাভাষী মুসলিম মধ্যবিত্তদের আন্দোলন। এর শ্রেণি চরিত্র বিপ্লবী সমাজতন্ত্রী নয়। তাই তারা এই আন্দোলন নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামাতে চান না।

মার্কসবাদের সংজ্ঞায় পৃথিবীতে ‘জাতি’ বলে কিছু নেই। জাতি, জাতীয়তা বা জাতীয়তার গর্ব হলো এক বুর্জোয়া অপসৃষ্টি। দুনিয়ার মানুষ আসলে দু’টি অর্থনৈতিক শ্রেণিতে বিভক্ত। এক শ্রেণির আছে (Have) এবং আরেক শ্রেণির নেই (Have not)। যাদের আছে তারা হলো ধনী। যাদের নেই তারা হলো দরিদ্র। এই দুই শ্রেণির অবসান ঘটিয়ে শ্রেণিহীন সমাজ গড়াই হতে হবে রাজনীতির মূল লক্ষ্য। ভাষার পার্থক্য নিয়ে রাজনীতি করতে গেলে বিচ্যুত হতে হবে এই মূল লক্ষ্য থেকে। তাই রাজনীতিতে কমিউনিস্টরা আর যাই হোক জাতীয়তাবাদী হতে পারে না। কেননা, জাতীয়তাবাদ আসল হলো বুর্জোয়াদের ব্যাপার। এ ছিল এদেশের বামপন্থিদেরও একাংশের রাজনৈতিক চিন্তার মূল ভিত্তি।

এখন এদেশের অনেক বামপন্থি দাবি করছেন ভাষা আন্দোলন ছিল মূলত তাদের দ্বারা পরিচালিত আন্দোলন। কিন্তু আসলে তারা এই আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন জনবিচ্ছিন্ন হয়ে না পড়বারই জন্যে। কেননা, সেদিন সারা পূর্ব পাকিস্তানের বাংলাভাষী মানুষ এসে দাঁড়িয়েছিলেন উর্দুর সঙ্গে বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করবার আন্দোলনেরই কাতারে।…

ভাষা আন্দোলন কেবলই একটি ভাষাভিত্তিক আন্দোলন ছিল না। এই আন্দোলন সৃষ্টি হতে পেরেছিল আর্থ-সামাজিক কারণেও। ১৯৫২ সালের সব বড়বড় সরকারি চাকরি করছিলেন উর্দুভাষী মুসলমান। এর ফলে বাংলাভাষাী মুসলমানের মনে দেখা দিয়েছিল এক সাধারণ ভীতি। তারা ভাবছিলেন, উর্দুর মাধ্যমে যদি তাদের প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা দিয়ে উচ্চ সরকারি পদ পেতে হয়, তবে সেটা তাদের জন্যে হবে খুবই কষ্টকর।

কিন্তু উর্দু যাদের মাতৃভাষা অথবা হয়ে উঠেছে মাতৃভাষার মতো তাদের পক্ষে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় সাফল্যলাভ হবে অনেক সহজ। সারা পাকিস্তানের এমনকি পূর্ব বাংলার অধিকাংশ উচ্চ সরকারি পদে তারাই হবেন অধিষ্ঠিত। পূর্ব বাংলা চলে যাবে উর্দুভাষীদের নিয়ন্ত্রণে। বাংলাভাষী মুসলমান নিজভূমে হয়ে উঠবেন পরবাসী। বাংলাভাষী মুসলমান তাই প্রণোদিত হয়েছিলেন ভাষা আন্দোলনে। ভাষা আন্দোলন শেষ পর্যন্ত গ্রহণ করেছিল একটা বিরাট গণআন্দোলনেরই রূপ।”


এবনে গোলাম সামাদ, আত্মপরিচয়ের সন্ধানে (ঢাকা: পরিলেখ প্রকাশন, ই-বুক সংস্করণ—বইটই)


Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email
Related Articles
Recent Articles

রাফান আহমেদ-এর বইসমূহ

আলাদাবইওয়াফিলাইফ

Copyright © Rafan Ahmed

No part of the website or posts can be published elsewhere without prior permission from author.  

Copyright © 2021 All rights reserved

error: Content is protected !!