Physician | Author | Blogger

ডারউইনবাদ ভুল হলে কী জীববিজ্ঞান পুরোটাই ভুল হবে

এক নজরে

আমরা অনেকেই শুনেছি ডারউইনবাদ ভুল হলে জীববিজ্ঞান পুরোটাই নাকি ভুল হবে অথবা বিবর্তনবিদ্যা ভুল হলে নাকি আমাদের ল্যাবরেটরির যত এক্সপেরিমেন্ট সবই ভুল হবে। এই ধারণা আমাদের মাঝে বহুল প্রচলিত। তবে ধারণাটা ঠিক না। না, আমি বলছি না। এটা বিবর্তনবাদি অ্যাকাডেমিকদের মত। পপুলার বিজ্ঞান আর অ্যাকাডেমিক বিজ্ঞানের ফারাক বরাবরই প্রকট, সচেতন ব্যক্তিমাত্রই জানেন। একটু খুলে বলি।

যারা বলেন—বিবর্তনবিদ্যা ভুল হলে নাকি আমাদের ল্যাবরেটরির যত এক্সপেরিমেন্ট সবই ভুল হবে—তারা মূলত দুই রকম বিজ্ঞানের ভিতরে বুনিয়াদি পার্থক্য বুঝেন না। বিজ্ঞানের বুনিয়াদি বা মৌলিক জ্ঞান যাদের আছে তারা জানেন সমসাময়িক বিজ্ঞানের দুইটা ভাগ (আর্নেস্ট মায়ার, ২০০৪ঃ২৪-২৫):

১. অপারেশনাল/ফাংশনাল/মেকানিস্টিক সায়েনস (প্রায়োগিক জীববিদ্যা)
২. হিস্টোরিক্যাল/ নন-ফাংশনাল সায়েনস (ইতিহাস-কেন্দ্রিক জীববিদ্যা)

এই দুইটার ভিতর মৌলিক পার্থক্য হচ্ছে—ফাংশনাল সায়েনস কাজ করে প্রক্সিমেট কজেশান নিয়ে। অর্থাৎ কোনো ঘটনা তার ঠিক আগের কোন ঘটনা তথা কারণের ফলাফল হিসেবে ঘটেছে এটা নিয়ে আলোচনা করে। এই নিকট সম্পর্কযুক্ত কারণ এবং তার ফলাফল নিয়ে এর মাথাব্যথা। যেমন স্তন্যপায়ী প্রাণিরা কীভাবে দেহের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে? কীভাবে ব্যাকটেরিয়া অক্সিজেন ব্যবহার করে? ভাইরাস কীভাবে আচরন বদলায়? কীভাবে পরিণত স্যামন মাছ বংশবিস্তারের জন্য নিজের জন্মস্থানে সাঁতরে আসে? লোহিত রক্তকোষ কীভাবে অক্সিজেন সরবরাহ করে? ডায়াবেটিসে কী ঘটে? ইত্যাদি। এসকল ক্ষেত্রে খুঁজে দেখা হয় কীভাবে একটি জীবন্ত সিস্টেম কাজ করছে। একটি ঘটনার জন্য পূর্বের কোন ঘটনা/কারণটি দায়ি/সম্পর্কিত মনে হচ্ছে। এগুলো অধিকাংশই বিভিন্নমাত্রায় পর্যবেক্ষণযোগ্য।

অন্যদিকে হিস্টরিকাল সায়েনস বা ইতিহাস-কেন্দ্রিক জীববিদ্যায় সুদূর অতীতে কী ঘটেছিল তা অনুমান করা হয় ‘বর্তমানকাল হলো পুরাকালের চাবি’ এই অনুমানের উপর নির্ভর করে। নব্য-ডারইনবাদের অন্যতম পুরোধা আর্নেস্ট মায়ারের মতে, ইতিহাস-কেন্দ্রিক জীববিদ্যা ‘সম্ভাবনামূলক চিত্রকল্প’ (tentative scenarios) নির্মান করে। সুদূর অতীতে গিয়ে আমাদের পক্ষে দেখে আসা সম্ভব না আসলেই কী ঘটেছিল। তাই বর্তমানে ক্রিয়াশীল প্রক্রিয়া দেখে অতীতের সম্ভাব্য চিত্র আঁকা হয়। এক্ষেত্রে আগেই অনুমান করে নেয়া হয় প্রাণির কোনো আচরণ পরিবেশের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে গিয়ে বিবর্তনের ফলে হয়েছে। তারপর প্রাকৃতিক নির্বাচন ও অ্যাডাপটেশানের ছকে সেটার চিত্র আঁকা হয়।

ফলে ফাংশন সায়েনস ও হিস্টরিকাল সায়েনস—এ দুটোর ভেতর মৌলিক পার্থক্য জ্ঞানতাত্ত্বিক বলা যায়।

ফাংশনাল সায়েনস থেকে আমরা যা অবজার্ভ করি, পর্যবেক্ষণ করি এগুলা যে পরিমাণ জ্ঞানতাত্ত্বিক নিশ্চয়তা দেয় হিস্টরিকাল সাইনস তা দিতে পারে না। পাশাপাশি বিবর্তনতত্ত্ব আগাগোড়া ভুল হলেও ল্যাবরেটরি এক্সপেরিমেন্ট-এর কিছু যাবে-আসবে না। এর কারণ বিবর্তনবিদ্যা বা ডারউইনবাদ মূলত হিস্টরিক্যাল সায়েনস নিয়ে কথা বলে। ল্যাবরেটরিতে আমরা যে বিষয়গুলো স্টাডি করি সেইটা অপারেশনাল সায়েনস-এর আন্ডারে পড়ে যেখানে মূলত প্রক্সিমেট কজেশন/নিকট কার্যকারণ খোঁজা হয়। যেমন লোহিত রক্তকোষ হিমোগ্লোবিনের মাধ্যমে বেশ জটিল প্রক্রিয়ায় অক্সিজেন বহন করে, অগ্ন্যাশয়ের বিটা কোষ থেকে বিশেষ কারণে ইনসুলিন আসা কমে গেলে ডায়াবেটিস হয়, ভাইরাস তার দেহের বিশেষ জায়গার সজ্জা বদলে আচরণে তারতম্য আনে ইত্যাদি। লোহিত রক্তকোষ যেভাবে অক্সিজেন বহন করছে বিবর্তনতত্ত্ব মিথ্যা হলেও সেভাবেই করে যাবে, একইভাবে ডায়াবেটিস হতে থাকবে, ভাইরাস ছড়াতে থাকবে। অর্থাৎ প্রায়োগিক জীববিদ্যা ও নিকট কার্যকারণ মূলত বিবর্তনের ইতিহাস থেকে স্বতন্ত্র পরিমণ্ডলে কাজ করে। এখানে মনোযোগের কেন্দ্রে থাকে বর্তমান, অতীত না।

তাই কেউ যদি মনে বিবর্তন ভুল হলে ল্যাবরেটরির সব এক্সপেরিমেন্টই ভুল হবে তারা আসলে জীবিজ্ঞানের বুনিয়াদটাই বুঝতে পারে নি এখনো। বিবর্তনতত্ত্ব আগাগোড়া ভুল হলেও ল্যাবরেটরি এক্সপেরিমেন্ট-এর তেমন কিছু যাবে-আসবে না। কারণ বিবর্তনবিদ্যা বা ডারউইনবাদ মূলত বর্তমানের দিকে তাকিয়ে কিছু অনুমান সাথে নিয়ে অতীতের কথা বলে। ল্যাবরেটরিতে আমরা যে বিষয়গুলো স্টাডি করি সেটা প্রায়োগিক জীববিদ্যার অংশ যেখানে মূলত নিকট কার্যকারণ খোঁজা হয় এবং সে অনুযায়ী বর্তমানের কারণ ও ফলাফল বয়ান করা হয়।

নাস্তিক বিবর্তন গবেষক ও বিজ্ঞানের দার্শনিক সামির ওকাশা অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে প্রকাশিত বইতে এই বাস্তবতা স্বীকার করে বলেন (সামির ওকাশা, ২০১৯):

স্পষ্টতই জীববিজ্ঞানের অধিকাংশ গবেষণা বিবর্তন সম্পর্কিত না। রেইনফরেস্টে জীববৈচিত্র্য নিয়ে গবেষণাকারী ইকোলজিস্ট, ভাইরাস ক্লোন করার চেষ্টায় মত্ত অণুজীববিজ্ঞানী, বনে থাকা শিম্পাঞ্জি নিয়ে গবেষণাকারী প্রাইমেটবিশারদ—এরা সকলেই বর্তমানে কী ঘটছে তা নিয়ে চিন্তিত, সুদূর অতীতে কী হয়েছিল সেটা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা নেই। তাই ডারউইনের মত ভুল হয়ে যদি ধর্মগ্রন্থে বর্ণিত সৃষ্টিকাহিনী সঠিক হয়, তারপরও দৈনন্দিনের বৈজ্ঞানিক গবেষণা একইরকমভাবে চলতে থাকবে—এমনটা কেউ ভাবতে পারে। এমন ভাবনা সঠিক বলা যায়, যদিও জীববিদ্যার অনেক অনুসন্ধানের গোড়ায় বিবর্তনকে স্থান দেয়া হয়েছে। … নিকট কার্যকারণসংক্রান্ত প্রশ্ন বিবর্তন-ইতিহাস থেকে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বতন্ত্র। এমনকি ডারউইনের তত্ত্ব ভুল হলেও এতে কিছু আসে যায় না।… তবে (ইতিহাস-কেন্দ্রিক জীববিদ্যার চর্চায়) চূড়ান্ত কার্যকারণ হিসেবে আগেই বিবর্তন সত্য বলে ধরে নেওয়া হয়, তারপর অ্যাডাপটেশান ও প্রাকৃতিক নির্বাচনের ছাঁচে ফেলে ব্যাখ্যা করা হয়।

মোটামুটি একই কথা কিন্তু আর্নেস্ট মায়ার বলেছিলেন থিওডোসিয়াস ডবঝান্সকি-র বহুল পরিচিত ডিকটাম Nothing in Biology make sense except in the light of Evolution এই বক্তব্যের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে। আর্নেস্ট মায়ার বলেছিলেন—ডবঝান্সকির বক্তব্যটা হিস্টরিকাল বায়োলজি ক্ষেত্রে খাটলেও ফাংশনাল/অপারেশনাল বায়োলজি মোটাদাগে এটা থেকে স্বতন্ত্র (আর্নেস্ট মায়ার, ২০০৪):

জিনবিদ থিওডসিয়াস ডবঝান্‌স্কির বিখ্যাত বক্তব্য—‘বিবর্তনের চোখে না দেখলে জীববিদ্যার কোনোকিছুই অর্থবহ হয় না’—এটি নিঃসন্দেহে ইতিহাস-কেন্দ্রিক জীববিদ্যার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।

অর্থাৎ আমরা বুজতে পারছি বিজ্ঞানের পপুলার চিত্র আর অ্যাকাডেমিক চিত্রের মাঝে গুরুতর ফারাক আছে। বিজ্ঞানকে এগিয়ে নিতে, বিজ্ঞানকে বস্তুবাদীদের আগ্রাসন থেকে মুক্ত করে সামনে নিতে বিজ্ঞানকে যথাযথভাবে অনুধাবন জরুরি।


তথ্যসূত্র:
১. আর্নেস্ট মায়ার (২০০৪), হোয়াট মেকস বায়োলজি ইউনিক (ক্যাম্রব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা)
২. সামির ওকাশা (২০১৯), ফিলসফি অফ বায়োলজিঃ আ ভেরি শর্ট ইন্ট্রোডাকশন (অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় প্রকাশনা)


ফিচারড ইমেজ কার্টিসি: ফ্রিপিক
Background vector created by rawpixel.com – www.freepik.com

Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email
Related Articles
Recent Articles

রাফান আহমেদ-এর বইসমূহ

আলাদাবইওয়াফিলাইফ

Copyright © Rafan Ahmed

No part of the website or posts can be published elsewhere without prior permission from author.  

Copyright © 2021 All rights reserved

error: Content is protected !!