Physician | Author | Blogger

বিজ্ঞান ও নাস্তিকতা

এক নজরে

নাস্তিকতার প্রচারে মূলত বিজ্ঞানকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে দেখা যায়। বিশ শতকের পশ্চিমা মহলে এই অপচেষ্টার ব্যাপকতা লক্ষ করা যায়। প্রভাবশালী সাম্রাজ্যের কূটনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের স্রোতে আমার প্রিয় বাংলাতেও নাস্তিকতা প্রচারে বিজ্ঞানকেই হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ‘বিজ্ঞানের গান’ গেয়েই তারা নাস্তিকতা প্রচারে অগ্রণী হয়। কিন্তু আসলেই কি নাস্তিকতা বৈজ্ঞানিক? কখনোই নয়! কেন?

এর কারণ বুঝতে হলে প্রথমে বুঝতে হবে নাস্তিকতা কাকে বলে। সোজা কথায় বলা যায়—স্রষ্টার অস্তিত্বে অবিশ্বাস করা। তবে ব্যবহারিক দৃষ্টিতে, নাস্তিককে দার্শনিক প্রকৃতিবাদ (Philosophical/Metaphysical Naturalism) বা বস্তুবাদে বিশ্বাসী বলা যায়। নব্য নাস্তিক্যবাদের অন্যতম পুরোধা নাস্তিকদের পরিচয় দিয়েছেন (রিচার্ড ডকিন্স, ২০০৮):

নাস্তিক হলো এমন ব্যক্তি, যে বিশ্বাস করে পার্থিব-ভৌত জগতের বাইরে কিছুই নেই। কোনো স্রষ্টা নেই যিনি দৃশ্যমান এই মহাবিশ্বের পিছনে চুপিসারে কলকাঠি নাড়ছেন। আত্মার কোনো অস্তিত্ব নেই যা মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকে, নেই অলৌকিক বলে কোনো কিছু। কেবলই রয়েছে জাগতিক ঘটনাবলী, যা আমরা এখনও বুঝে উঠতে পারিনি।

তোমরা কি একটা বিষয় খেয়াল করলে? আমি বলেছি, নাস্তিকেরা বস্তুবাদে ‘বিশ্বাসী’? অর্থাৎ দার্শনিক প্রকৃতিবাদ তথা বস্তুবাদ একটি বিশ্বাসগত (Belief) অবস্থান! দর্শনের একেবারে বেসিক জ্ঞান এটা। (ফিলসফি ব্যাসিকস.কম) নাস্তিক দার্শনিক থেকেও স্বীকারোক্তি পাওয়া যায় (মাইকেল রুজের স্বীকারোক্তি; রবার্ট স্টুয়ার্ড, ২০০৭):

আপনি যদি স্বীকারোক্তি চান তবে শুনুন, আমি সব সময় স্বীকার করেছি বস্তুবাদ হলো স্রেফ বিশ্বাসগত অবস্থান …

অধিকাংশ নাস্তিক এটা জানে না। যারা জানে তারা এ ব্যাপারে চুপ থাকে। কারণ, ধর্মকে তারা স্রেফ অন্ধবিশ্বাস বলে সমালোচনা করে; তারা নিজেরাও যে আরেক বিশ্বাস প্রচার করে এটা মানুষ জানলে তাদের অবস্থানকে উত্তম ভাববে না। তাই, নাস্তিকেরা তাদের বিশ্বাসকে বিজ্ঞান দিয়ে মুড়িয়ে ফেরি করে। কিন্তু কেন?

আমরা আলোচনা করেছি বিজ্ঞান পদ্ধতিগত প্রকৃতিবাদকে (Methodological Naturalism) খুঁটি হিসেবে ধরে জগৎ বোঝার প্রয়াস চালায়। যার লক্ষ্য হলো চোখের-সামনে-থাকা এই অবাক বিশ্বের কোনো ঘটনা ব্যাখ্যার সময় কেবল জাগতিক ব্যাখ্যাই দেওয়া হবে। স্রষ্টা আছে কি নেই, সে বিষয়ে কথা বলা হবে না। কারণ এই প্রশ্ন বিজ্ঞানের চৌহদ্দির বাইরে। আমরা আমেরিকার ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অব সাইন্সেস-এর বিবৃতি দেখেছি :

বিজ্ঞান হলো প্রাকৃতিক জগৎ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের একটি উপায়। প্রাকৃতিক জগৎ সম্পর্কে জাগতিক ব্যাখ্যা প্রদানেই এটি সীমাবদ্ধ। অতিপ্রাকৃত কিছু আছে কি না, সে বিষয়ে বিজ্ঞান কিছুই বলতে পারে না। স্রষ্টা আছেন নাকি নেই—এ প্রশ্নের ব্যাপারে বিজ্ঞান নীরব।

অধিকাংশ মানুষ বস্তুবাদ আর প্রকৃতিবাদের মাঝে পার্থক্য জানে না। তারা ভুল ভেবে বসে—যেহেতু বিজ্ঞান খুঁজে পায়নি, তার মানে সেটার অস্তিত্ব নেই! যেমন আমাদের দেশে নাস্তিকতা প্রচারকারীদের বুক ফুলিয়ে বলতে শোনা যায় (রায়হান আবির ও অভিজিৎ রায়, ২০১৬):

[আ]ধুনিক বিজ্ঞান এখন যে জায়গায় পৌঁছে গেছে ঈশ্বর বলে কিছু থেকে থাকলে কোনো-না-কোনোভাবে বিজ্ঞানের চোখে ধরা পড়ার কথা ছিল …

এ ধরণের মানসিকতার সাথে বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই, বরং কেবল বিজ্ঞানবাদীতায় আক্রান্ত হলে মানুষ এমন বোকাসোকা কথা বলে বসে। নাস্তিক স্নায়ুবিদ রেমন্ড ট্যালিস এই বাস্তবতা আলোকপাত করে বলেন:

যেহেতু বিজ্ঞানের চোখে ধরা পড়েনি, তাই এর কোনো অস্তিত্ব নেই—এমন মানসিকতার সাথে বিজ্ঞানের কোনো সম্পর্ক নেই। বরং এমন কথা তারাই বলে যারা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানকে সর্বশক্তিমান বানিয়ে ফেলেছে। এটা বিজ্ঞানবাদী আচরণ।

তাছাড়া সাধারণ মানুষ বুঝতে পারে না যে—এই ধরণের বক্তব্য স্রেফ কুযুক্তি (সার্কুলার রিজনিং ফ্যালাসি)! কাউকে আগেই ঘর থেকে বের করে দেওয়ার পর যদি তুমি বলো, কই? ও তো ঘরে নেই! তা হলে ব্যাপারটা কেমন দাঁড়ায়? বিজ্ঞান জগৎ ব্যাখ্যা করার আগেই প্রতিজ্ঞা করে নেয়—স্রষ্টার হস্তক্ষেপ বিবেচনা করা ব্যতীতই জগৎ ব্যাখ্যা করা হবে। তাই এর ব্যাখ্যা কেবলই জগতকেন্দ্রিক হবে। তাই স্রষ্টা থাকা না-থাকার প্রশ্নে আজকের বিজ্ঞান নীরব হয়ে বসে থাকে। একজন নামকরা মহাকাশবিদকে স্বীকার করতে দেখা যায় (অ্যালেক্স ফিলিপ্পেনকো’র বক্তব্য; আরটি নিউজ, ২০১২):

[আ]মি মহাবিশ্বকে একজন বিজ্ঞানীর দৃষ্টিকোণ থেকে আলোচনা করতে চাই… কোনো অতিমানবিক বা স্বকীয় স্রষ্টা আছেন নাকি নেই অথবা এই মহাবিশ্বের কোনো উদ্দেশ্য আছে নাকি নেই, সে বিষয়ে আমি কিছু বলব না। কারণ, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর বিজ্ঞানীরা দিতে পারে না।

কিন্তু তরুণরা এতসব সহজে বুঝতে পারে না/চায় না। একে তো জ্ঞান কম থাকে, তার ওপর প্রবৃত্তির টান—দুয়ে মিলে তারা বিবেক-জ্ঞান দ্বারা কম, বরং আবেগ দ্বারাই বেশি তাড়িত হয়। এর অপব্যবহার করে কিছু সুযোগ-সন্ধানী-মানুষ! স্বনামখ্যাত পদার্থবিদ প্রফেসর এম. এ. হারুন অর রশিদ নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বলেছিলেন (এম. এ. হারুন অর রশিদ এর বক্তব্য; রায়হান আবির ও অভিজিৎ রায়, ২০১৬):

ঈশ্বরের অস্তিত্ব বা অনস্তিত্ব বিজ্ঞানের বিষয় নয়, এটা বুঝতে তরুণ মনের সময় লাগে অনেক…

আমি চাই না তোমাদের সেই সময়টা নষ্ট হোক। আমার বড়ো আশা, তোমরা তরুণেরা এই ভুল কাজ করবে না। চিন্তার সুস্থধারা সামনে এগিয়ে নিয়ে যাবে তোমরাই। বিজ্ঞানের অ্যাকাডেমিক অনুধাবন তোমাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়াই আমার ক্ষুদ্র প্রচেষ্টা। যখন বিজ্ঞানকে ঠিকভাবে বুঝতে পারবে তখন এসব ভুলভাল থেকে নিজেকে ও অন্যকে দূরে রাখার চেষ্টা করতে পারবে। অমন বোকাসোকা কথা কেউ বলতে আসলে, তাকে অ্যাকাডেমিক অনুধাবন বুঝিয়ে বলতে পারবে (হিউ গাউচ, ২০১২):

প্রকৃতিবাদ বিজ্ঞানের আগ্রহ ও ব্যাখ্যার পরিসীমাকে নানাবিধ প্রাকৃতিক ব্যাপার ও ঘটনাবলীর মাঝে সীমাবদ্ধ করে দেয়। স্রষ্টা বা ফেরেশতা ইত্যাদি অতিপ্রাকৃতিক কোনো কিছুকে ব্যাখ্যাস্বরূপ টেনে আনে না।… এখন প্রকৃতিবাদের সাথে বস্তুবাদের পার্থক্যটি ভালোভাবে লক্ষ করুন। বস্তুবাদ অনুসারে প্রাকৃতিক নানাবিধ বস্তুর অস্তিত্ব রয়েছে বটে, তবে অতিপ্রাকৃত কোনো কিছুরই অস্তিত্ব নেই। নাস্তিকরা এমনই দাবি করে থাকেন। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে, বিজ্ঞানের প্রকৃতিবাদ অতিপ্রাকৃত কোনো কিছুর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে না। বরং বলে—অতিপ্রাকৃত ব্যাপার-স্যাপার বিজ্ঞানের আওতার বাইরে। দুঃখজনক হলেও সত্য, প্রকৃতিবাদকে প্রায়ই বস্তুবাদের সাথে গুলিয়ে ফেলা হয়। তাই কেউ যদি এমন ধারণায় অটল থাকে যে—বিজ্ঞান প্রকৃতিবাদ মেনে চলে এবং এটি নাস্তিক্যবাদ অথা বস্তুবাদকেও সমর্থন করে; তবে এরকম প্রবল উৎসাহপূর্ণ কথার জন্য তাকে বেশি নাম্বার দেওয়া হলেও, যুক্তির খাতায় সে কম নাম্বার পাবে।

তাদের আত্মবিশ্বাসের সাথে বুঝিয়ে দেবে, নাস্তিকতা কোনো বৈজ্ঞানিক ব্যাপার নয়, বরং এটা বিশ্বাসগত অবস্থান। এর সাথে বিজ্ঞানের সন্ধি নেই (লি বিলিংস, ২০১৯)৯। তারা দুষ্টুমি শুরু করলে, বিশ শতকের অন্যতম প্রভাবশালী ও খ্যাতনামা বিবর্তনবিদ কার্ল উওস-এর কথা শুনিয়ে দিতে পারো (সুজান মাজুর, ২০১৩):

[মা]নুষ বলে—নাস্তিকতা নাকি বিজ্ঞান-নির্ভর। এই কথা আমার মোটেও পছন্দ হয় না। কারণ, কথাটা ভুল। আদতে নাস্তিকতাকে তুলনা করা যায় ভিনগ্রহের প্রাণির সাথে; যে বিজ্ঞানের উপর আক্রমণ চালিয়ে তা দখল করে নেওয়ার পাঁয়তারা করছে।

এরপরও দেখবে তাদের একাংশ সত্যকে মানতে চাইবে না। তাদের তুমি বলবে—সালাম! কেন বলবে জানো তো? (আল-কুরআন ২৫ : ৬৩) তাদের পিছে আর সময় নষ্ট না করে তুমি হাঁটতে শুরু করবে দিগন্ত-পানে। নরম রোদ এসে ছুঁয়ে যাবে তোমার শরীর। তোমার মনে পড়বে, যারা বিজ্ঞান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান রাখে না তারাই বিজ্ঞানের উপর ভর করে নাস্তিকতার পথ বেছে নেয়; নিজের ক্ষতি করতে চায়। হয়তো মনে পড়বে, মুঠোফোনে এক নাস্তিককে কলম ফসকে লিখতে দেখেছিলে (তসলিমা নাসরিন, ২০১৯):

সায়েন্স পড় সায়েন্স পড় বলে বলে মানুষকে র‍্যাশনাল হওয়ার উৎসাহ দিয়েছি জীবনভর। লাভ হয়নি। সায়েন্সে পড়া মানুষগুলো, মানে ওই ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ারগুলো, ফিজিক্স কেমেস্ট্রির পণ্ডিতগুলো, বেশিরভাগই দেখি ধর্মের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকে। ধর্মের আজগুবি গপ্প নিয়ে সন্দেহ করে, প্রশ্ন করে, বা ধর্ম থেকে সরে আসে যারা, তারা অধিকাংশই আর্টসের সাব্জেক্ট নিয়ে লেখাপড়া করেছে, সাহিত্য বা দর্শন পড়েছে, আর্ট কলেজে পড়েছে, ফিল্ম নিয়ে পড়েছে। তা হলে বিজ্ঞানমনস্ক হওয়ার জন্য বিজ্ঞান মুখস্ত করার দরকার হয় না, বিজ্ঞান পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ারও দরকার হয় না!

তুমি জানো তারা বিজ্ঞান বুঝে না, তুমি জানো তারা নিজেদের ক্ষতি করছে। কিন্তু তুমি তাদের আঁধারে নেই আর। আকাশের লাল-নীলের সাথে তুমি মিলেমিশে একাকার। তুমি হাঁটতে থাকবে, মিষ্টি হাওয়া এসে তোমার সাথে কানে কানে কথা বলবে। হয়তো তোমার মনে হবে পায়ের নিচে অনেকগুলো নরম ডানা! তুমি পা ওঠাতে গেলে সেখান থেকে কী যেন ঝিকিমিকি করে ছড়িয়ে পড়ছে চারিদিকে! দিগন্তে তুমি দেখছ নিশানা, নিজের মাঝেও খুঁজে পেয়েছ সেই ডাক! তুমি হাঁটছ, অনন্তের পথে যাত্রায়।

ভেসে যাক আলোর বানে
যত আঁধার-কালো,
আলোকে মুক্ত করো
অমল-নিয়ন আলো!
Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email
Related Articles
Recent Articles

রাফান আহমেদ-এর বইসমূহ

আলাদাবইওয়াফিলাইফ

Copyright © Rafan Ahmed

No part of the website or posts can be published elsewhere without prior permission from author.  

Copyright © 2021 All rights reserved

error: Content is protected !!