Physician | Author | Blogger

সেক্যুলার লিবারেল ব্যবস্থা বর্ণবাদি ও সন্ত্রাসবাদি

এক নজরে

লিবারেলিজমের বাঙলা করা হয় উদারনীতিবাদ। সেকুলারিজমের বাঙলা করা হয় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ। দুইটা অনুবাদই ডাহা মিছে। যারা লিবারেলিজম ও সেকুলারিজমের ইতিহাস জানেন তারা ঠিকই ধরতে পারেন এই ভাঁওতাবাজি। তারা জানেন শুরু থেকেই সেকুলারবাদ ও লিবারেলবাদ হলো সহিংসতা, বর্নবাদ ও উপনিবেশবাদের আকর। যার গোড়া দাঁড়িয়ে আছে এনলাইটেনমেন্টের উপর। কিছু বাস্তবিক নমুনা আলোচনা করলে ব্যপারটা বুঝে আসবে।

(১)

“দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে বিগত ষাট বছরে সারা দুনিয়াতে প্রায় পাঁচ থেকে সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ মারা গেছে পশ্চিমা উপনিবেশবাদ আর নয়া উপনিবেশবাদী তৎপরতায়। তর্কসাপেক্ষে, এই অল্প সময়ের মধ্যেই মানব সভ্যতা ইতিহাসের সবচাইতে ভয়াবহ কিছু গণহত্যা দেখেছে। এসকল ভয়াবহ গণহত্যার বেশিরভাগই সংগঠিত হয়েছে দুটি সস্তা শ্লোগানের ওপর ভর করে – গণতন্ত্র ও স্বাধীনতা।…

অথচ এসকল ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডগুলো সম্পর্কে পশ্চিমা জনগণের মাঝে দেখা যায় এক নিদারুণ অজ্ঞতা আর ভুল তথ্যসমৃদ্ধ বোঝাপড়া। প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি মানুষ নিহত হয়েছে পশ্চিমা শক্তিগুলোর দ্বারা সূচিত যুদ্ধে, কিন্তু পরোক্ষ হিসেবে আরও কয়েক কোটি মানুষ নিহত হয়েছে পশ্চিমা শক্তিগুলোর সহায়তায় স্থানীয়ভাবে সৃষ্ট গৃহযুদ্ধ আর সামরিক অভ্যু্থানগুলোর মাধ্যমে। এই হত্যাকাণ্ড গুলোর অনেকগুলোই ঘটেছে চরম নিষ্ঠুরতায় আর নীরবে। যুদ্ধ আর মানুষ হত্যার এসকল পরিকল্পিত আয়োজনগুলোকে খুব কম সময়েই চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে পশ্চিমা দুনিয়ায়। এমনকি দখলকৃত ভূমিতেও এসকল হত্যাকাণ্ডকে মেনে নেয়া হয়েছে প্রায় বিনা প্রতিবাদে। দুনিয়া কি উন্মাদ হয়ে গেল?…

এটা দুর্ভাগ্যজনক, তবুও এই প্রশ্নটিই বরং কঠিন যে, পশ্চিমের করা কোন অপরাধটি আসলে সবচাইতে ভয়াবহ? কলম্বাস যখন পশ্চিম গোলার্ধে পা রাখল, তখন এই ভূমিতে প্রায় আট থেকে দশ কোটি মানুষের বসবাস ছিল, যথেষ্ট উন্নত সভ্যতা, ব্যবসা বাণিজ্য আর নগর সভ্যতার ইতিহাস ছিল সেই জনগোষ্ঠীতে ৷ খুব সময় লাগেনি সেই জনগোষ্ঠীর প্রায় পচানব্বই শতাংশকে ধ্বংস করে দিতে । সেই ভূমিটির নাম এখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেই প্রায় এক কোটি আদিবাসীর বসবাস ছিল, আর সরকারি হিসাব মতে, ১৯০০ সালের মধ্যেই তা নেমে আসে দুই লাখে। কেউ জিজ্ঞেস করেনি, কেন?

মূল ভূমিপুত্রদের এই ধ্বংস হয়ে যাওয়াকে চেপে গেছে সবাই, গোপন করেছে সবাই, প্রত্যাখ্যান করেছে সবাই, নেতৃস্থানীয় বুদ্ধিবৃত্তিক প্রায় সকলেই ভুলে গেছেন সে ইতিহাস, সকলেই অস্বীকার করেছেন সে ইতিহাস। এই ভুলে যাওয়া, এই অস্বীকার করার ঘটনাগুলো ঘটেছে, প্রায়শই কোনো রকমের ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ বা মন্তব্য ছাড়াই।”

(২)

“সন্ত্রাসবাদের কেচো খুঁড়িতে গিয়া সভ্যতার সাপ বাহির হইয়া আসিতেছে। ২০০১ সালের অনেক আগে হইতেই আধা ইংরেজ আধা মার্কিন প্রাচ্য বিশারদ বানার্ড লুইস প্রমুখ পণ্ডিত ‘সভ্যতার সহিত সভ্যতার সংঘাত’ প্রভৃতি আওয়াজ তুলিতেছিলেন। স্যার বিদিয়াধর সুরজপ্রসাদ নাইপলের মতন জনপ্রিয় লেখক আর সামুয়েল হান্টিংটন প্রমুখ প্রচারক তাহাই বাজারে ছাড়িয়া জোর লাভবান ইইয়াছেন। আসাদ দেখাইতেছেন: “সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ” মানে “সভ্যতার সহিত সভ্যতার সংঘাত” নহে, প্রকৃত প্রস্তাবে ইহা অসভ্যতার বিরুদ্ধে সভ্যতার যুদ্ধ মাত্র। উনিশ শতকের উপনিবেশিক যুদ্ধেও এমন যুক্তিই দেখানো হইত।

এসলাম ধর্মের অন্তরে সন্ত্রাসবাদ জন্মসূত্রে গৃহীত বলিয়া যাহা প্রচারিত হইতেছে তাহার অর্থ এই যে এসলাম ধর্মের অন্তর্গত বিষাদই সভ্যতার পরিপন্থী। সুতরাং নিজের আমূল সংস্কার না করিলে সভ্যজগতে কাহারও জায়গা নাই। পাশ্চাত্যের এই নগ্ন প্রচারের অতি উৎসাহে আর আতিশয্যে আরো ভয়ানক প্রমাদ আছে। তালাল আসাদ প্রমাণ করিয়াছেন আত্মঘাতী বোমা বা আদমবোমা এসলাম ধর্মের অন্তরে প্রোথিত চিরস্থায়ী সত্য নহে অর্থাৎ ইহাকে ইমানের সহিত সমান মর্যাদা দেওয়া যাইবে না।

এই বোমাবাজি শুদ্ধ ইতিহাসের বিশেষ পর্যায়ের বা পরাধীন মুসলমান সমাজের পরাধীনতার প্রকাশ মাত্র। পরাধীনতা দূর হইলে আদমবোমা জিনিসও ফরাসি কিংবা মার্কিন দেশে বীমা করিয়া জাদু প্রদর্শনীতে পাঠানো সম্ভব হইবে।

রবার্ট পাপ (Robert Pape) নামক জনৈক পশ্চিমা রাষ্ট্রপণ্ডিত গুণিয়া দেখাইয়াছেন ২০০১ সালের আগের ২২ বছরের মধ্যে – অর্থাৎ ১৯৮০ হইতে ২০০১ সালের ভিতর তামাম দুনিয়ায় ১৮৮টির মতন সাধারণ আদম ওরফে আত্মঘাতী বোমা ফাটিয়াছে। নানান দেশের রাষ্ট্রীয় সেনাবাহিনীঘটিত আত্মঘাতী বোমার হিসাবটা ইহার মধ্যে ধরা হয় নাই। পাপ সাহেব দেখাইতেছেন দ্বাবিংশ বৎসর পূর্বে গোনা এই ১৮৮টি আদমবোমার মধ্যে গোটা ৭৫ ফাটাইয়াছে শ্রীলঙ্কার তামিল ব্যাঘকুল ওরফে তামিল টাইগার্স দল। ইহারা জাতে তামিল, তালে মার্কসবাদী – লেনিনবাদী আর ধর্মে হিন্দু বলিয়া প্রকাশ। (আসাদ ২০০৭: ৫৪) ইহাতেই প্রমাণ এই বিষয়ে এসলাম ধর্মের কোন একচেটিয়া অধিকার নাই। পশ্চিমা পণ্ডিতগণ এই সত্য হজম করিবেন কী করিয়া?

তালাল আসাদ প্রমাণ করিয়াছেন, আদমবোমা শুদ্ধ মুসলমানরাই ফাটায় না, অন্য ধর্মাবলম্বীরাও ফাটাইতে পারে। আর এসলাম ধর্মও এমন কথা বলে নাই যে সকল যুগে সকল দেশে এই জাতীয় বোমা বানাইতে কিংবা ফাটাইতে হইবেই। না বানাইলে বা না ফাটাইলে ধর্মই থাকিবে না এমন কথা মুসলমানের ধর্মবিশ্বাসের অঙ্গও নয়। তবুও আজকাল এই এসলামবিরোধী প্রচারযুদ্ধ জোরদার হইতেছে। কিন্তু কেন? তাহার কারণ খুঁজিতে হইবে ইতিহাসে।

তালাল আসাদ মনে করেন, মধ্যপ্রাচ্যে বর্তমানে যে অসম যুদ্ধ চলিতেছে কলাকৌশলে তাহা নবীন হইলেও চরিত্রে আগেকার যুগের ঔপনিবেশিক বা পররাজ্যলোভী দখলদারী যুদ্ধেরই হুবহু নতুন সংস্করণ। যদি তাহাই হয় তবে পশ্চিমের যুদ্ধ সভ্যতার সহিত সভ্যতার যুদ্ধ নয়—অসভ্যতার সহিত সভ্যতার যুদ্ধ মাত্র। ইহারই অপর নাম বর্ণবাদ।

তালাল আসাদ রচিত আদমবোমা (On Suicide Bombing) পড়িলে সেই বর্ণপরিচয় গাঢ় হয়। তালাল দেখাইতেছেন পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ বর্ণবাদী বলিয়াই তাহারা পশ্চিমের সাথে যুদ্ধে পরাজিত সকল অপশ্চিমা জাতিকে “অসভ্য” বা জংলি বলিয়া গালি দেন। তাহারা বলেন, অসভ্য জাতির যোদ্ধারা নিষ্ঠুর, দয়া-মায়া কথাটা উহাদের অভিধানে নাই। তাই তাহাদের প্রতি দয়া দেখাইবার প্রশ্নই ওঠে না। আসাদ বলিয়াছেন, পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যাধিপতিরা যেভাবে নানান যুদ্ধাপরাধকে—যেমন নির্বিচার হত্যা, বন্দি নির্যাতন এমনকি অসামরিক গণহত্যাকেও— মানবদরদী কর্মের উদাহরণ বলিয়া চালাইয়া দিতেছেন তাহার তুল্য কোন যুক্তি তথাকথিত অসভ্য জাতিগোষ্ঠী কোনদিনও দেখাইতে পারে নাই। পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ যে কতখানি সভ্য হইয়াছে ইহাতে তাহাই নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয়।”


তথ্যসূত্র:
(১) নোম চমস্কি, পশ্চিমা সন্ত্রাসবাদ প্রসঙ্গে: হিরোশিমা থেকে ড্রোনযুদ্ধ; পৃ. ২২-২৩ (ঢাকা: চৈতন্য, ২০১৯)
(২) ড. সলিমুল্লাহ খান, আদমবোমা, পৃ. ৪৬-৪৭ (ঢাকা: আগামি প্রকাশনি, ২০১৩)


Photo by rarrarorro via Getty Images

Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email
Related Articles
Recent Articles

রাফান আহমেদ-এর বইসমূহ

আলাদাবইওয়াফিলাইফ

Copyright © Rafan Ahmed

No part of the website or posts can be published elsewhere without prior permission from author.  

Copyright © 2021 All rights reserved

error: Content is protected !!