Physician | Author | Blogger

ধর্মনিরপেক্ষতা ও একাত্তর

এক নজরে

ইতিহাসের রাজনীতিকরণ ও নির্মোহ দৃষ্টিকোন থেকে ইতিহাস অধ্যয়নের অভাবে অনেকে ৭১-এর সংগ্রামের সঠিক প্রেক্ষাপট জানেন না। ফলে ভেবে বসেন ৭১-এর সংগ্রাম হয়েছিল ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য। কথাটা ঐতিহাসিকভাবে সত্য নয়। মূলত ওয়েস্টফালিয়ান-নীতি পুষ্ট আতাতুর্কবাদীদার উপর পাকিস্তানের রাজনৈতিক কাঠামো দাঁড় করানো চেষ্টা তথা সেকুলার নীতিতে পাকিস্তানকে ঐক্যবদ্ধ রাখার চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে (এবং বৈশ্বিক ও স্থানীয় বহিঃরাজনীতির ছলাকলায়) বিভেদের পথ সুগম হয়। মুক্তিযোদ্ধাসহ কয়েকজন লেখকের বিশ্লেষণে ব্যাপারটা স্পষ্ট হয়ে উঠে।

(১)

“ ’৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের বিজয়ের পরে আমি ব্যক্তিগতভাবে দারুণ উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম । রাজনীতিতে আনুষ্ঠানিকভাবে হাতেখড়ি না থাকলেও আমি চেতনাহীন ছিলাম না। বাঙালীর জীবনের দুঃখ কষ্ট আমাকে ভাবিয়ে তুলতো, বাঙালী-বিহারী, বাঙালী-পাঞ্জাবী দ্বন্দ্ব আমাকে পীড়া দিত। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য আমাকে লাঞ্ছিত করতো । তাই ‘৭০ এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ঐতিহাসিক বিজয়ের মধ্যে আমি খুঁজে পেয়েছিলাম আমার অবিকাশিত সত্তার মুক্তির প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত।

সত্য অনুসরণে আমার নিষ্ঠা থাকলেও প্রতিহিংসার অনল আমাকে অহরহ দহন করেছে। এ অনল আমি জ্বলতে দেখেছি প্রত্যেকটি সাধারণ বাঙালীর বুকে। এই প্রতিহিংসার দাবানল বিস্ফোরিত হলো আওয়ামী লীগের নির্বাচনী বিজয়ের মধ্য দিয়ে। বিহারী তাড়াও, পাঞ্জাবী তাড়াও এক কথায় অবাঙালী পূর্ব পাকিস্তান থেকে তাড়াও এই চেতনাটি অত্যন্ত স্বতঃস্কুর্তভাবেই বিকশিত হতে লাগল। সত্তরের শেষ এবং একাত্তরের শুরুর সেই অগ্নিঝরা দিনগুলোতে পূর্ব পাকিস্তানের সংগ্রামী জনগণের মাঝে বিজাতীয়দের চরম ঘৃণা ও বিদ্বেষ পরিলক্ষিত হলেও ইসলাম ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ মোটেও পরিলক্ষিত হয়নি, অথবা ধর্মহীনতা আমাদের পেয়ে বসেনি। তথকালীন সময়ে কষ্টর আওয়ামী লীগার বলে পরিচিত নেতা কর্মীদের মুখে ‘ধর্মনিরপেক্ষতার’ নাম গন্ধও শুনতে পাইনি।

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী দামাল তরুণ যুবকদের অধিকাংশই ছিল এদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানের সন্তান সন্ততি। যুদ্ধের রক্তাক্ত ময়দানেও আমি মুক্তিযোদ্ধাদের দেখেছি বাকায়দা নামায পড়তে, দরূদ পাঠ করতে । তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শাসককুল পবিত্র ইসলাম ধর্মকে বিভিন্ন সময়ে তাদের হীন স্বার্থে ব্যবহার করেছে বিধায় তাদের বিরুদ্ধে সচেতন জনগণ সোচ্চার ছিল বটে, তবে প্রকাশ্যে পবিত্র ইসলাম ধর্মের প্রতি কোন মহলই ঘৃণা কিংবা বিদ্বেষ প্রদর্শন করেনি । ইসলাম ধর্মের বিষয়টি আমি এখানে এ কারণে উল্লেখ করেছি যে, আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পূর্বের ইসলাম এবং মুক্তিযুদ্ধের পরের ইসলাম-এর মধ্যে হঠাৎ করে এমন কি ঘটে গেল যাতে ইসলামের কথা শুনলেই কোন কোন মহল পাগলা কুকুরের মত খিঁচিয়ে উঠেন। যে দেশের শতকরা নব্বই জনেরও অধিক পবিত্র ইসলাম ধর্মের অনুসারী, সে দেশে এ করুণ উন্মাদনার মধ্য দিয়ে ধর্মের নিকুচি করা কি আদৌ যুক্তিসম্মত?

এই দুঃখজনক এবং লজ্জাকর অধ্যায়ের জন্য দায়ী কে বা কারা? বাস্তবতার অস্বীকৃতিই প্রতিক্রিয়াশীলতা নয় কী? অপরদিকে বাস্তবতার স্বীকৃতিই প্রগতির শর্ত এবং দাবী নয় কী? তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গর্ভেই বর্তমান বাংলাদেশ ভূমিষ্ঠ হয়েছে। সেই পূর্ব পাকিস্তানের অধিবাসীদের আচার আচরণ, উৎসব অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় এবং আধ্যাত্মিক মূল্যবোধ মুক্তিযুদ্ধের এক খোঁচায়ই কি বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে? এটা কি কারো খেয়াল খুশীর উপর নির্ভরশীল, না বাস্তব নির্ভর? আমাদের বস্তুনিষ্ঠ বিশ্লেষণ, আমাদের জাতীয় জীবনকে সুষ্ঠুভাবে বিকশিত করতে সক্ষম । সত্যানুরাগই কেবল আমাদের মুক্তির দিশারী হতে পারে অন্যথায় আমাদের ধ্বংসের জন্য আমরাই যথেষ্ট।”

মেজর (অব) এম.এ. জলিল (মুক্তিযোদ্ধা), অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা (ঢাকা: কমল কুঁড়ি প্রকাশন, ২য় প্রকাশ ২০১৯)

(২)

“[The dominant] narrative of Bengali nationalism ignores the significance and memories of 1947—where an overwhelming [sic] support for establishing a separate state for Muslims in the name of Pakistan was persisting among Bengali Muslims. While the above-mentioned root of secular Bengali nationalism [that gave Birth to Bangladesh in 1971] infused by Western thinkers and Tagore was clearly instrumental in the narrative [of] middle-class Bengalis, there were [a] large number of masses who did not seem to be bothered about the ‘secular’ of Bengali nationalism.”

Hasan, M. (2017). The Diverse Roots of the ‘Secular’ in East Pakistan (1947–71) and the Crisis of ‘Secularism’ in Contemporary Bangladesh. History and Sociology of South Asia, 11(2), 156–173

(৩)

“একজন ঘাদানিক নেতাকে বলতে শোনা গেল, মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তান। আমরা পাকিস্তান ভেঙে বেরিয়ে এসেছি। বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের তাই ঠাঁই হতে পারে না। কিন্তু আমাদের হাতের কাছে যে সামান্য দলিল দস্তাবেজ আছে, তা থেকে এরকম কোন মনোভাবের সমর্থন মিলছে না। ১৯৭১ সালে ১৭ এপ্রিল মুজিব নগরের বিখ্যাত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের তিনটি লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছিল: মানবতা (Humanity), মানবমর্যাদা (Human Dignity), সামাজিক সুবিচারের (Social Justice) কথা। এখানে ধর্মের প্রসঙ্গ মোটেও তোলা হয়নি। কোন কিছু বলা হয়নি ইসলামপন্থী রাজনীতির বিপক্ষে। কিন্তু আমাদের ঘাদানিক বন্ধুরা বলছেন যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের লক্ষ্য ছিল, ইসলামী রাজনীতি নিষিদ্ধকরণ। বাংলাদেশ স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রটি পাওয়া যাবে People Republic of Bangladesh—পক্ষ থেকে প্রকাশিত Bangladesh নামক বইতে। বইটি প্রকাশিত হয়েছিল প্রবাসি বাংলাদেশ সরকারের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ১৯৭১ সালে। যার ভুমিকা লিখেছিলেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খন্দকার মোস্তাক আহমেদ। আমাদের হাতে যথেষ্ট প্রমাণপঞ্জি নেই। তবে সামান্য যেটুকু আছে, তাতে হাজার বছরের বাঙালিত্বের আদর্শের উপর বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতিষ্ঠার চেষ্টা ছিল বলে কোন প্রমান পাওয়া যায় না। মুজিব নগরের বিখ্যাত ঘোষণাপত্রটিতে বলা হয়েছে, যেহেতু ইয়াহিয়া ভোটের রায় অনুসারে শেখ মুজিবকে সরকার গঠনের অধিকার থেকে বঞ্চিত করছেন, তাই বাংলাদেশ বাধ্য হচ্ছে স্বাধীনতা ঘোষণা করতে।”

এবনে গোলাম সামাদ, বায়ান্ন থেকে একাত্তর; পৃ. ৪৬ (ঢাকা: পরিলেখ, ২০১৭)


ছবি কার্টিসী: মুজিবনগর ওয়েবসাইট

Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email
Related Articles
Recent Articles

রাফান আহমেদ-এর বইসমূহ

আলাদাবইওয়াফিলাইফ

Copyright © Rafan Ahmed

No part of the website or posts can be published elsewhere without prior permission from author.  

Copyright © 2021 All rights reserved

error: Content is protected !!