Physician | Author | Blogger

একাত্তরে শাহবাগিদের মানসিকতা: কমরেডের চোখে

এক নজরে

[২০১৩ সালে এক যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবি ও সেকুলারিজম কায়েমের উদগ্র বাসনায় দেশ অস্থির করে তোলেন শাহবাগিরা। এদের কেন্দ্রের সিংভাগ ছিল বাম রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ও বামচিন্তাধারা পুষ্ট। তাদের দাবি তারাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পক্ষের শক্তি। বাকিরা হয় মৌলবাদি নয়তো রাজাকার। কিন্তু এই শাহবাগিদের অগ্রজরা মুক্তিযুদ্ধের সময় কি করেছিল? তাই জানা যাবে বিশিষ্ট সাংবাদিক, কলামিস্ট, বাম রাজনীতির পুরোধা, মুক্তিযোদ্ধা কমরেড নির্মল সেন-এর আত্মজীবনীতে। ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে তিনি মারা যান। তার আগের বছরই তার অটোবায়োগ্রাফি – আমার জবানবন্দী প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থ থেকে নিচে অংশটুকু তুলে ধরা হলো।]


১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর নতুন করে কোনো বামপন্থী দল জন্মগ্রহণ করেনি। সর্ব ভারতীয় সুত্রে বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টি ও বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক দল (আরএসপি) এর অস্তিত্ব ছিল। দু’টি দলের নেতৃত্বে ছিল মধ্যবিত্ত হিন্দু সম্প্রদায়! দেশ বিভাগের ফলে নেতৃত্বের শূন্যতা দেখা দেয়। অপরদিকে নেমে আসে পাকিস্তান সরকারের চরম নির্যাতন। কমিউনিস্ট পার্টি তার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ফলে কোনোরকম টিকে থাকলেও আরএসপির অস্তিত্ব নড়বড়ে হয়ে যায়। আত্মগোপন করে কমিউনিস্ট পার্টি অস্তিত রক্ষা করতে চেষ্টা করে। অপরদিকে আরএসপি শিল্প এলাকায় শ্রমিকদের মধ্যে কোনোমতে অস্তিত টিকিয়ে রাখে।

এ পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনকে কেন্দ্র করে বিভক্তি দেখা দেয়। আমাদের দেশের কমিউনিস্ট পার্টি একান্তভাবেই বিদেশ নির্ভর বলে একেবারে যান্ত্রিকভাবে এদেশের কমিউনিস্ট পার্টিতেও মস্কোপন্থী ও পিকিংপন্থী হিসেবে বিভক্তি দেখা দেয়। ১৯৫৭ সালে কমিউনিস্ট পার্টি ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ন্যাপ গঠন করে। কমিউনিস্ট পার্টির কথায় এ দলটি ছিল প্রগতিশীল জাতীয় বুর্জোয়াদের প্রতিষ্ঠান। কমিউনিস্ট পার্টি নিষিদ্ধ থাকায় এ দলের মাধ্যমে তাঁরা কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ইতিপূর্বে কমিউনিস্ট পার্টি আওয়ামী লীগের মাধ্যমে কিছুটা কাজ করতো। কিন্তু শহীদ সোহরাওয়ার্দী আওয়ামী লীগের নেতৃতে আসার পর বামপন্থীদের পক্ষে আওয়ামী লীগে কাজ করা অসম্ভব হয়ে ওঠে। শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন কট্টর কমিউনিস্ট বিরোধী এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থক। আর সেটা ছিল আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে ঠাণ্ডা যুদ্ধের যুগ। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে তখন তীব্র সংঘর্ষ ছিল। এই সবকিছু মিলেই এদেশের কমিউনিস্টদের আওয়ামী লীগ করা সম্ভব ছিল না এবং তাদের উদ্যোগেই গঠিত হয় ন্যাপ।

আশ্চর্যজনকভাবে লক্ষণীয় যে পিকিং মস্কো দ্বন্দ্ব ন্যাপেও প্রভাব ফেলে। ন্যাপ বিভক্ত হয়ে যায়। ন্যাপের প্রথম সভাপতি ছিলেন মওলানা ভাসানী। আর মস্কোপন্থী অংশের প্রেসিডেন্ট হলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের এ বিভক্তি বামপন্থী আন্দোলনে বিপর্যয় ডেকে আনে। পরবর্তীকালে দুই ন্যাপেই ভাঙন সৃষ্টি হয়। মস্কোপস্থী নামের ভাঙন সীমাবদ্ধ ক্ষেত্রে হলেও পিকিংপন্থী ন্যাপের ভাঙনের কোনো শেষ ছিল না। এদের কোনো কোনো অংশ ৭১-এর যুদ্ধের বিরোধিতা করেছে। আর মক্কোপন্থী ন্যাপের বন্ধুরা মস্কোর নির্দেশ ব্যতীত কোনো পদক্ষেপই নেয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীনতা যুদ্ধ সম্পর্কে গোপনে তারা যতই দলিল লিখুক না কেন প্রকাশ্যে তাদের ভূমিকা ছিল বিভ্রান্তিমূলক ৷ ১৯৭১ সালের মার্চ মাসের পূর্বে তাদের কেউই আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ স্বাধীনতার পক্ষে ভূমিকা গ্রহণ করেনি।

নোট: লাল-মওলানা ভাসানী ১৯৭০ সালের ৪ ডিসেম্বর পল্টনের এক জনসভায় স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তান এর দাবি উত্থাপন করেন। ভাসানীর এই দাবিকে সমালোচনা করেছিল ১৯৭১-এর ২৫ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত সিপিবি-র (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি) এক প্রস্তাবপত্রে। প্রস্তাবপত্রে তৃতীয় দফায় শাহবাগি অগ্রজরা লিখেন-‘জাতীয়তাবাদী তথাকথিত স্বাধীন পূর্ব বাংলার নামে অবাঙালিবিরোধী জিগির তুলিয়া এবং মওলানা ভাসানী স্বাধীন পূর্ব পাকিস্তানের আওয়াজ তুলিয়া জনগণের মনে পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণের বিরোধী মনোভাব গড়িয়া তুলিয়া অবস্থাকে আরও জটিল ও ঘোলাটে করিয়া তুলিতেছে।’ (দেখুন: বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র, ২য় খণ্ড, পৃ ৬৫৭) অথচ এই শাহবাগি সিপিবি ও তার ছাত্রসংগঠনই নাকি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালন করে!

এ হলো কমিউনিস্ট বামপন্থীদের কথা। আর আমরা যারা আরএসপি করতাম তাদের বিপদ ছিল নানা দিক থেকে। শুধুমাত্র সরকার বা বুর্জোয়া দলগুলোর পক্ষ থেকে নয়, মস্কো এবং পিকিংপন্থী দুই কমিউনিস্ট পার্টি ছিল আমাদের ঘোর বিরোধী। আমাদের সম্পর্কে কোনো তাত্তিক লেখাপড়া না করেই আমাদের ট্রটস্কিবাদী বলে অভিহিত করত । আমার ছাত্রজীবন থেকে আমি নিশ্চিত যে আমাদের ওই বন্ধুদের অধিকাংশ ট্রটস্কির কোনো বইয়ের একটি পাতাও উল্টিয়ে দেখেনি। অনেককে আমি হেসে ইংরেজিতে ট্রটস্কি নামের বানান জিজ্ঞেস করে কোনো উত্তর পাইনি। তাদের এই অন্ধতা ও অন্ধ বিরোধিতা আমাদের পদে পদে ব্রিত করত।

মস্কো পিকিং বিভক্তির আগে ঐক্যবদ্ধ কমিউনিস্ট পার্টির বন্ধুরা বলতেন তারাই একমাত্র কমিউনিস্ট । অন্য সবাই আমেরিকার এজেন্ট। এই মনোভাব থেকেই তারা ৬০-এর দশকে আমাদের নেতৃত্বে আইয়ুব আমলে ঐতিহাসিক চটকল শ্রমিক ধর্মঘটের সময় তারা মালিকের সাথে সহযোগিতা করেছে। শ্রমিক স্বার্থবিরোধী চুক্তি করে ধর্মঘট ভেঙেছে। আর এই চটকল শ্রমিকদের ধর্মঘটের সাফল্যের মধ্য দিয়েই ষাটের দশকে আমরা রাজনীতিতে পথে উঠেছিলাম। ১৯৬৯ সালে এককালের আরএসপির নেতা ও কর্মীদের উদ্যোগে আমরা গঠন করেছিলাম শ্রমিক কৃষক সমাজবাদী দল। এ দল গঠনের এক বছরের মধ্যেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম আসন্ন হয়ে উঠল। এ কথা সত্য, চটকল শ্রমিকদের ধর্মঘট শিল্প এলাকায় এক নতুন সংগ্রামের পরিবেশ সৃষ্টি করে। খুলনা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত সকল শিল্প এলাকায় শ্রমিকরা আন্দোলনমুখী হয়ে ওঠে। তখন শ্রমিক এলাকায় আমরা ছাড়া কাজী জাফরদের সংগঠন ছিল টঙ্গী এলাকায় । আমরা আন্দোলন করেছিলাম কঠোর সামরিক সরকারের আমলে। আইয়ুব খান তখন প্রেসিডেন্ট। মোনায়েম খান গভর্নর৷ এই আন্দোলনে আমাদের সাফল্যে শ্রমিকরা সাহসী হয়ে উঠল। ষাটের দশকের শেষ দিকে ঘেরাও আন্দোলনের শরিক হয় এবং সেই জোয়ারেই তারা ১৯৭১ সালের সংগ্রামে ঝাপিয়ে পড়ে ।

আমাদের বাম প্রগতিশীল কোনো লেখকের লেখায় এই ইতিহাস পাওয়া যাবে না। তারা লিখবেন না যে আমাদের কোনো ভূমিকা ছিল। এককভাবে সবকিছু যেন তারা করেছেন। অথচ একাত্তরের পূর্বেও সে আন্দোলনে তাদের তেমন কোনো ভূমিকা ছিল না।

কিন্তু ৭১-এর সংগ্রামে আমাদের তেমন ইতিবাচক ভূমিকা ছিল না। আমরা আমাদের শ্রমিকদের ৭১-এর সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য নির্দেশ দিয়েছিলাম কিঃ? আদৌ নয়। আমি ইতোপূর্বে বারবার উল্লেখ করেছি বাংলাদেশের স্বাধীনতার কথা। এ ব্যাপারে সেকালের বিভিন্ন আত্মগোপনকারী বামপন্থী দলসহ ছাত্রলীগের নেতারাও আমাদের সাথে কথা বলেছেন। আমরা বারবারই বলেছি স্বাধীন বাংলাদেশের রূপরেখা আমরা জানতে চাই। আমরা আর একটা পাকিস্তান গড়তে চাই না। আমরা শোষণমুক্ত বাংলাদেশ চাই। এ কথায় আমাদের সাথে আলোচনা ভেঙে গেছে। আমাদের ভূমিকা ওই পর্যন্তই ৷ এর পরে আমরা দেশ স্বাধীন করার নিজস্ব কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করিনি। হাত-পা গুটিয়ে বসে থেকেছি। ১৯৭১ সালে সংগ্রাম শুরু হওয়ার পর আমরা গভডালিকা প্রবাহে ভেসে গিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সেজেছি। আমার জানা মতে এটাই ছিল মোটামুটিভাবে বামপন্থীদের ভূমিকা।

আরো পড়ুন:
ভাষা আন্দোলন নিয়ে প্রগতিশীল অগ্রজদের দোটানা
সাম্প্রদায়িকতা নিয়ে বামদের ভ্রান্তি
উইঘুর হলোকাস্টের গোড়ায় প্রগতিশীল চেতনা

পরিস্থিতি এমন হলে একাত্তরের পরে টগবগে অশান্ত তরুণদের দলে টানা যেত। তাদের আকৃষ্ট করা যেত। আমি মনে করি বামপন্থীদের ভূমিকার জন্যেই আওয়ামী লীগের সেই অশান্ত তরুণরা ভিন্ন দল করেছে। প্রতিষ্ঠিত কোনো বাম দল তাদের টেনে নিতে পারেনি। তবে ষাটের দশকের শেষ দিকে পূর্ব বাংলা স্বাধীনতার ভাক দিয়ে একটি নতুন দল আত্মপ্রকাশ করেছিল দলটির নাম সর্বহারা পার্টি। নেতৃত্বে ছিলেন কমরেড সিরাজ সিকদার। দলটি কখনো ঘোষণা দিয়ে প্রকাশ্যে আসেনি। এ দলের অনেক সদস্যই অকাতরে প্রাণ দিয়েছে । কিন্ত্র এক সময় কোনো অর্জন ছাড়া এ দলের জীবন দেয়াটাই বড় হয়ে উঠেছিল। ফলে দেখা দেয় অভ্যন্তরীণ সংকট এবং নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব। এ দলটি চমক সৃষ্টি করলেও কোনো বিকল্প রাজনীতির ছবি তরুণদের চোখের সামনে তুলে ধরতে পারেনি।

আলাদাবইওয়াফিলাইফরকমারিবইটই (ই-বুক)

এই প্রেক্ষাপটেই দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে একটি নতুন পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছিল। একটি রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর বৃহৎ শক্তিগুলোর ভবিষ্যদ্বাণী ব্যর্থ করে দিয়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছিল। জন্ম নিয়েছিল একটি সংগ্রামী তরুণ গোষ্ঠী। সেকালের বামপন্থীরা ভাদের ধারণ করতে পারেনি। ধারণ করতে পারলে এদেশের ইতিহাস ভিন্নভাবে লিখিত হতো। … এসময় মাঝে মাঝে খুব খারাপ লাগত । নিজেকে মনে হতো লেখাপড়া না করলে ভালো হতো। আমার পড়া কিতাবের কোনো কিছুই কাজে লাগছে না। দেশে মুখ্যত তখন তিন দলের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টি, গণতান্ত্রিক জোট ‘গজ’ গঠন করেছে। মনে হয় মুক্তিযুদ্ধের মালিকানা তাদের। অন্য কারো কিছু বলার নেই। ১৯৭৩ সালের ১ জানুয়ারি ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা ভিয়েতনামে মার্কিন হামলার বিরুদ্ধে মিছিল করতে গিয়ে গুলি খেয়েছিল। প্রায় বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে। এবার ভিন্ন স্লোগান দিচ্ছে। স্লোগান হচ্ছে-দেশ স্বাধীন করেছি। এবার দেশ গড়ার পালা। সত্যি সত্যি ছাত্র ইউনিয়নের ছেলেরা অধিক খাদ্য ফলাও অভিযানের অঙ্গ হিসেবে বীজতলা গড়ে তুলল। জিজ্ঞাসা করলে বলত ওটা আপনারা বুঝবেন না। আপনারা হটকারী। প্রকৃতপক্ষে সেকালে কমিউনিস্ট পার্টি চলত মস্কোর নির্দেশে। তাদের তত্ত্ব হচ্ছে, মস্কোর সাথে যে দেশের সম্পর্ক ভালো সে দেশের সরকারও ভালো। (অর্থাৎ দেশপ্রেম বা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নয় বরং সম্ভবত মস্কোপ্রেম ছিল ছাত্র ইউনিয়নের কর্মকাণ্ডের মূল প্রেরণা। বাকিগুলো হাতসাফাই – আর. আহমেদ) সেই অনুসারে বাংলাদেশ সরকারও ভালো। বাংলাদেশের সাথে সোভিয়েত ইউনিয়নের সুসম্পর্ক। তাই বাংলাদেশ সরকারকে সমর্থন করতে হবে। ন্যাপের স্বতন্ত্র অস্তিত থাকলেও রাজনীতি একই।


নির্মল সেন, আমার জবানবন্দী, পৃ ৫৭৩-৫৭৯ (ঢাকা: ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ, ২০১২) (এম্ফ্যাসিস অ্যাডেড)

Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email
Related Articles
Recent Articles

রাফান আহমেদ-এর বইসমূহ

আলাদাবইওয়াফিলাইফ

Copyright © Rafan Ahmed

No part of the website or posts can be published elsewhere without prior permission from author.  

Copyright © 2021 All rights reserved

error: Content is protected !!