Physician | Author | Blogger

ছোটগল্প: কালো মেঘের দল

এক নজরে

(১)
তাওসিফের মন ভালো নেই। আকাশে মেঘ হলে এক সময় বৃষ্টি হয়, চারপাশ ভিজে যায়। এক সময় সূর্যের হাসিতে আনন্দের ঢেউ উঠে। কখনো আবার রোদ্দুর আর বর্ষণ হয় একই সাথে। হয়তো খেকশিয়ালগুলো সেসময় আনন্দে বিয়ে করে।

কিন্তু তাওসিফের মনে আনন্দ নেই। তার মনের মেঘ থেকে কোনো বৃষ্টি হচ্ছে না।

বেশকিছুদিন ধরে নামাযে মন আসে না। একদমই না। পাঁচবার মসজিদে এসে নামায পড়েও লাভ হচ্ছে না। উলটো নামাযের সময়ই যেন সেসব অশ্লীল দৃশ্য আর চিন্তা চোখের সামনে জান্তব হয়ে উঠে। নিরবে হওয়া নামাযগুলোতে যেন সে কানে শব্দও শুনতে পায়।

নাহ আর ভাবা যাচ্ছে না। মুখ তেতো হয়ে আসছে। তাওসিফ বিছানা থেকে উঠে গেল। রাত প্রায় দেড়টা। চারদিক চুপচাপ, শুধু ওর মনের ভেতরেই ঝড়। এমন এক ঝড় যার প্রবল ঝোড়ো হাওয়া আর উত্তাল শো শো শব্দ কেউই শুনতে পায় না।

ঢক ঢক করে এক গ্লাস পানি খেল সে। জানালার পাশে দাঁড়ালো এসে।

কেন আমার দুয়া কবুল হচ্ছে না! আর কত? এভাবে পারছি না। আমাকে কেন ফিরিয়ে দেয়া হচ্ছে? তাওসিফের সমস্যাটা আজকের না। সেই ক্লাস ফাইভ থেকে। বন্ধুদের পাল্লায় পরে নীল জগতে হাবুডুবু খেতে থাকে সে। বুঝতে পারে নি কোন নেশায় সে আটকে যাচ্ছে। হুঁশ হলো যখন নিজের মাকে দেখে একসময় সেই বাজে দৃশ্যগুলো আসা শুরু করলো। ছবির জগতের শুধু মুখটা বদলে গেল। একসময় নিজের ছোট্ট বোনটার মুখও ভেসে উঠলো। কি বাজে! ছিহ!

একসময় বের হতে চাইল সে। চেষ্টা করছে সেই থেকে। বিজ্ঞানগ্রুপের বড় ভাইরা বুঝায়, আরে এসব নরমাল। এত টেনশন নিস না।

কিন্তু ওর কাছে তো নরমাল লাগে না। বাবা-মার কাছে শুনেছে ও মুসলিম। আল্লাহর কাছে চাইলে নাকি সব পাওয়া যায়। সেই থেকে চেষ্টা চলছে।

অনেক কষ্টে নামায ধরেছে। দুয়া কবুল হওয়ার জন্য মসজিদেও যাওয়া শুরু করেছে মাস ছয়েক হলো। কিন্তু বিধিবাম! আজও সাঁতরে উঠে আসতে পারছে না। মাঝেমাঝে প্রচন্ড রাগ হয় তার প্রতি। আমাকে দেখে না কেন! কেন তিনি এত যৌনাকাঙ্ক্ষা দিলেন বা নারীদের সৃষ্টি করলেন! মাঝেমধ্যে হতাশ হয়ে দোয়া করাই ছেড়ে দেয় সে।

ফেসবুকে কিছু ভাইয়ের কাছে শেয়ার করেছে কথাগুলো। তারাও সাহস যুগাচ্ছেন, কিন্তু আর কত!তাওসিফের মনে হচ্ছে সে ডুব দিবে। একদম গভীরে ডুব। রাতের আঁধার কাঁদছে হিয়াচারিদিক চুপইচ্ছে করে মন হারিয়েদিই একটা ডুব!

(২)
হাসান ভাইয়ের সাথে কথা হয়েছে। নামাযের পর কিছুক্ষণ বসতে বললেন। ইমামের নাকি তার সাথে কথা বলবে। তাওসিফ ভাবে, কি আর বলবে? আমি জাহান্নামি ছাড়া! আমার কষ্ট বুঝবে কে!

মুখ ভর্তি হাসি দিয়ে ওর দিকে এগিয়ে এলেন জামিল সাহেব। তরুণ ইমাম। কেমন আছো ছোটভাই? তোমার ব্যাপারে হাসান আমাকে বলেছে। বসো। হাসান, খাদিম সাহেবকে বলো নাস্তা নিয়ে আসতে। আমার রুমে আছে।

তোমার কষ্টে আমি ব্যথিত। ঠিক যেমন কেউ ভুল করে হাত কেটে ফেললে কষ্ট লাগে। সতর্ক থাকলে শুরুতেই হাতটা কাটা যেত না। তুমি যেই সমস্যাটায় ভুগছো সেটা কিন্তু এক নিরব মহামারী। করোনা নিয়ে আমরা তো সচেতন, কিন্তু এই নীলজগতের ক্ষতি নিয়ে কেউই সচেতন না। তোমাকে অভিবাদন জানাই যে তুমি সঠিক পথে আসার জন্য সংগ্রাম করছো। কিন্তু সংগ্রামটা হয়ে গেছে ইলম ছাড়া। অনেকটা ঢাল তলোয়ার ছাড়া যুদ্ধের মতন।

তাওসিফ শুনে যায়, লোকটার বড় মায়াভরা গলা।

ইসলাম শুধু দুয়া করতে শিখায় নি আমার প্রিয় ভাই। দুয়া আর দাওয়া একসাথে অবলম্বন করতে বলেছে। দেখো ইসলাম শুরুতেই সকল অশ্লীলতা বন্ধের জন্য আধ্যাত্মিক, সামাজিক ও আইনগত ব্যবস্থা রেখেছে। ইসলাম পর্নগ্রাফিকে হারাম ঘোষণা করেছে। যারা সমাজে এসব ছড়াতে চাইবে তাদের শাস্তির ব্যবস্থাও করা হবে। কিন্তু আমরা সেকুলার সমাজে থাকি, তাই সামাজিক আর আইনগত দিকটা হারিয়েছি। রয়ে গেছে সেলফ ডেভলপমেন্ট আর আধ্যাত্মিক দিকটা। দ্রুত বিয়ে করার পরামর্শ রয়েছে ইসলামে। যৌনচাহিদা নিয়ন্ত্রনে নজরের হেফাজতের পাশাপাশি সাপ্তাহিক রোযা রাখতে বলা হয়েছে। রাসুল (সা) তো বিবাহিত জীবনে অনেক নফল রোযা রেখেছেন।

দেখো ভাই, ইসলাম এটা শেখায় না যে দুয়া করলেই সব বদ অভ্যেস হাওয়া হয়ে যাবে। অভ্যেস যেমন একদিনে গরে উঠে না তেমনি একদিনে যায় না। মদ হারামের হুকুম কিন্তু একবারেই আসে নি। আধ্যাত্মিক উন্নয়নের হাত ধরে ক্রমে ক্রমে এসেছে। যখন এসেছে তখন এমন এক অর্জন করেছে সেই প্রাচিন সমাজ যা আজকের আধুনিক সমাজও চেষ্টা করে পারে নি।

তোমার এই সংগ্রামে আমল ও দুয়ার পাশাপাশি সাকোলজিকাল ও স্পিরিচুয়াল কাউন্সেলিং, লাইফ স্টাইল চেঞ্জ, দরকারে হলে অবসেশনের জন্য ওষুধ সবই চেষ্টা করতে হবে। এসব না করে শুধু দুয়া করায় ফায়দা আসবে না। আগে তো উটটা বাধবা তারপর তো তাওয়াক্কুল। আল্লাহর প্রতি সুধারনা অনেক বড় ইবাদত। যে আল্লাহর প্রতি যেমন ধারনা করে তার সাথে তেমন আচরণ করা হয়। হাল ছাড়লে চলবে না।

কথা শেষে। তাওসিফ উঠে আসে, নিজেকে বেশ হালকা লাগছে। জামিল সাহেব একটা বই উপহার দিয়েছেন, নাম ‘ঘুরে দাড়াও।’ ওর মতো আরো কিশোর, তরুণদের কাউন্সেলিং এর জন্য একটা প্রজেক্ট হাতে নিয়েছেন। নাম দিয়েছেন ‘মেঘের বাড়ি’। এলাকার এক সাইকিয়াট্রিস্টও আছেন এখানে। তাবলিগের সাথী নাকি, ইমাম সাহেব বললেন। তাওসিফ ভুল বুঝেছিল। অনেক কিছুই জানা ছিল না। জেনেছে, বুঝেছে নিজের ভুলের জন্য ও আল্লাহকে দোষ দিচ্ছিল। ঠিক যেই কাজ করার দ্বারা শয়তান বিতাড়িত হয়েছিল।

তাওসিফের মনে জমে থাকা কালো মেঘের দল যেন সরতে শুরু করেছে। ও ভুলে গিয়েছিল – এভ্রি ক্লাউড হ্যাজ আ সিলভার লাইনিং।

(ফেসবুকে প্রকাশিত, ০৯ জুন ২০২১, শহুরে রাত) | Feature Image @bendavisual

Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email
Related Articles
Recent Articles

রাফান আহমেদ-এর বইসমূহ

আলাদাবইওয়াফিলাইফ

Copyright © Rafan Ahmed

No part of the website or posts can be published elsewhere without prior permission from author.  

Copyright © 2021 All rights reserved

error: Content is protected !!