Physician | Author | Blogger

বাঙালিয়ানার অজানা পরিচয়

এক নজরে

আমরা এমন একটা বাংলাদেশে বড় হয়েছি যেখানে এলিট/বুদ্ধিজীবীরা গণের পক্ষে না থেকে গণবিরোধী শিখণ্ডী দাঁড় করিয়ে আসছেন যুগ যুগ ধরে। মুক্তিযুদ্ধ বনাম ইসলাম, বাংগালিত্ব বনাম ইসলাম‍ এই ন্যারেটিভ দেখে, শুনে বড় হয়েছে আমাদের প্রজন্ম। এর কারণ আলোচনার শেষে আমরা বুঝার চেষ্ঠা করবো। তবে তার আগে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্রগুলোতে কীভাবে ইসলামভীতি ক্রিয়াশীল তা বুঝার জন্য নিচের ছবিগুলো উত্তম নমুনা।

১৯৭১ সালে ১৭ এপ্রিল মুজিব নগরে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের তথা মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র ছিল মানবতা (Humanity), মানবমর্যাদা (Human Dignity), সামাজিক সুবিচারের (Social Justice)। কিন্তু এসবের বদলে প্রগতিশীলদের কাছে ভাস্কর্যই মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র হয়ে উঠেছে‍। তাই ভাস্কর্যের বিরোধিতা করায় তারা জুনায়েদ বাবুনগরী সাহেবকেও পাকিস্তানের পতাকার টুপি আর প্যান্ট পরিয়ে ক্যারিকেচার এঁকেছে। এমনকি মামুনুল হক সাহেব বঙ্গবন্ধুর সমর্থনে কথা বললেও ভাস্কর্যের বিরোধিতা করায় রেহাই পাচ্ছে না‍। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে যেন ভাস্কর্য বিরোধিতা মানেই স্বাধীনতা বিরোধিতা‍ করা, এরাই পাকিস্তানের চর‍! তাদের আচরণে মনে হয় ভাস্কর্য স্থাপন করাই ছিল স্বাধীনতার মূলমন্ত্র‍। যদিও যে গণতান্ত্রিক অধিকার ফিরিয়ে না দেয়ার কারণে মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত, তা পুরোটা লোপাট হয়ে যাওয়াতেও তাদের মাথাব্যথা নেই। এটা নতুন কিছু নয়। কোটা আন্দোলন, সড়ক আন্দোলনের সময়ও আমরা দেখেছি ন্যায্য অধিকার চাইতে যাওয়া তরুন-কিশোদেরও রাজাকার বানিয়ে দেয়া হয়েছে। এক পর্যায়ে ন্যায্য কোনো দাবি জানালে রাজাকার আখ্যা দিয়ে শোষণ জায়েজ করার অপসংস্কৃতির প্রতিবাদে তরুণেরা নিজের গায়ে লিখেছে, যদি ন্যায্য অধিকার পেতে গেলে রাজাকার আখ্যা পেতে হয় তাহলে ‘আমিই রাজাকার!’ এতে স্তম্ভিত হয়ে গেছেন জাফর ইকবালের মত মুক্তিযুদ্ধ-ব্যবসায়িরা।

ছবি: দৈনিক ইত্তেফাক-এর সূত্রে

আমাদের সমাজে তরুণেরা দাড়ি, টাকনুর উপর কাপড়, নামায ঠিকমত পড়ার চেষ্টা, এমন কি ইসলামি পোস্টে লাইক দিলেও ভার্সিটিতে শিবির আখ্যা পেতে দেরি লাগে না। ইসলাম = পাকিস্তান = রাজাকার এই সরল অথচ ভুল সমীকরণ বিভক্তির রাজনীতিতে বহুকাল ধরে চর্চিত। সুশীলদের মাঝে এক প্রকার ডিলিউশান হলো, মুক্তিযুদ্ধ ছিল ইসলামের বিরুদ্ধে, পাকিস্থান ছিল যার প্রতীক। তারা বলতে চায়, মুসলিম সাম্প্রদায়িকতার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল পাকিস্তান। আমরা পাকিস্তান ভেঙে বেরিয়ে এসেছি। বাংলাদেশে ইসলামপন্থীদের তাই ঠাঁই হতে পারে না। অথচ ইতিহাস ঘেঁটে বুঝা যায় পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ ও ব্যর্থতার গোড়ায় ছিল সেক্যুলারিজম। নামকরা অ্যাকাডেমিক সালমান সাইদের পর্যবেক্ষণ জানায়, ওয়েস্টফালিয়-অনুপ্রেরণায় জন্ম নেয়া আতাতুর্কবাদের সেকুলার নীতিতে পাকিস্তানের ভিত্তি দাঁড় করানোর চেষ্টা শেষকালে বিভক্তির পথ সুগম করে তোলে (S. Sayyid, 2014:126):

“The break-up of united Pakistan should be seen as another failure of this Westphalian-inspired Kemalist model of nation building, rather than an illustration of the inability of Muslim political identity to sustain a unifed state structure.”

দেশের শাহবাগি চিন্তক থেকেও জানা যায়, মুক্তিযুদ্ধ বনাম ইসলাম এমন কোনো ডাইকোটমি যুদ্ধের সময় ছিল না। ক্রাচের কর্নেল লিখে বাংলা একাডেমি পুরস্কার পাওয়া সেক্যুলার লেখক শাহাদুজ্জামান লিখেছেন (শাহাদুজ্জামান, ২০১৪: ৩৬, ৩৯, ৭১):

“[পা]কিস্তান রাষ্ট্র যে শোষণমূলক ব্যবস্থা কায়েম করেছিল মুক্তিযুদ্ধ ছিল তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম, ইসলামের বিরুদ্ধে নয়। স্বাধীনতার পর মানুষের ধর্মীয় জীবনাচরণের ওপর কোনো রাষ্ট্রীয় বিধিনিষেধ তৈরি হয়নি, যেমন হয়েছিল কামাল আতাতুর্কের তুরস্কে। যিনি মুক্তিযুদ্ধ করেছেন তিনি নির্বিঘ্নে ইসলাম বা অন্য ধর্মচর্চা করেছেন। … মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে ইসলামের কোনো সাংঘর্ষিক সম্পর্ক নেই। … আমি মুক্তিযুদ্ধ এবং ইসলামকে … বাইনারি অপোজিশানে ফেলে আলোচনার পক্ষপাতি না। সেই সঙ্গে সেক্যুলারিজম বলতে যে পশ্চিমা আইডিয়াটা আছে, ঠিক সেই ফ্রেমওয়ার্কেও আমি ব্যাপারটাকে দেখি না। পাকিস্তান রাষ্ট্রে ইসলামকে ব্যবহার করে একটা শোষণমূলক ব্যবস্থা কায়েম করা হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধ ছিল সেই ব্যস্থার বিরুদ্ধে, ইসলামের বিরুদ্ধে না।”

শাহাদুজ্জামান হয়তো বুঝতে পারেন নি ওয়েস্টফালিয়ান-কামালিস্ট মডেল ছিল মূল সমস্যা, ইসলামকে যদি দোহাই হিসেবে আনা হয়েও থাকে তবে তা ছিলো চাতুরিমাত্র। ঠিক যেমন হিটলার বাইবেলকে ধূর্ততার সাথে ব্যবহার করতো তার নাৎসিবাদি এজেন্ডায়। সেই বিভক্তির মানসিকতাই চর্চিত হয়েছে সেক্যুলার মহলে আজ পর্যন্ত। একজন বামপন্থি লেখকের বিশ্লেষণে জানা যায় (পিনাকী ভট্টাচার্য, ২০১৭:৩১-৩৫):

“মুক্তিযুদ্ধের সময় যুদ্ধের পক্ষের সত্যিকারের তৎপরতা বা ধরাপড়া কোনাে সত্যিকারের রাজাকার দেখে তা থেকে প্রতীকায়িতভাবে রাজাকারের ধারণা হাজির হয়নি বা চিত্রিত হয়নি। এটা হয়েছে পুরােপুরি একটা পরিকল্পিত ইসলাম-বিদ্বেষ থেকে। যেমন মুক্তিযুদ্ধকালে যে সব রাজাকার ধৃত হয়েছিল, আত্মসমর্পণ করেছিল, তাদের ছবিতে আমরা দেখব বেশিরভাগের পরনেই কোনাে ইসলামি চিহ্ন বা প্রতীকের পােশাক ছিলাে না, স্বাভাবিকভাবে যেটা অনেক সময় থাকে। এমনকি কোথাও কোথাও স্বাভাবিক মুখে দাড়িও ছিলাে না। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ-বিরােধীদের ইসলামি লেবাসে উপস্থাপনের এই কাজটা করেছে বাংলাদেশের সেকুলারপন্থি ইসলাম-বিদ্বেষীরা। তারা মনে করে, কেবল পকিস্তানের সমরতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও শাসকের বিরুদ্ধে নয় অথবা পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে পূর্ব বাংলার কলােনিতুল্য সম্পর্কের বিরুদ্ধেই শুধু নয়- মুক্তিযুদ্ধের লড়াইটা বুঝি একই সাথে ইসলামের বিরুদ্ধেও হয়েছিল!”

পিনাকী সাহেবের পর্যবেক্ষণ একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। অল্পকিছু মানুষ জানেন যে ৭১-এর যুদ্ধের সময় যারা অখণ্ড পাকিস্তান চেয়েছিলো এবং মুক্তিবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র হামলা চালিয়েছিল তাদের মধ্যে অন্যতম ছিল পিকিংপন্থী বা চীনপন্থী কমিউনিস্টদের একটি দল। শুধু যুদ্ধের সময়েই নয়, যুদ্ধউত্তরকালে ১৯৭৪ এর ১৬ই ডিসেম্বর তাদের একাংশ ভুট্টোকে চিঠি পাঠিয়েছিল My Dear Prime Minister বলে। মুজিব সরকারকে উৎখাত করে পূর্ব-পাকিস্তান পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য ভুট্টোর কাছে অর্থ, অস্ত্র, বেতারযন্ত্র চেয়েছিলো তারা! (ড. আ. আলীম, ২০১:২৪৫-৩৪৬) এছাড়া যুদ্ধ চলাকালে ও উত্তরকালীন সময়ে মুক্তিযোদ্ধাদের একাংশ চুরি, ডাকাতি, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, হত্যা করেছে। (মেজর এম.এ.জলিল, ২০১৯:২৭) কিন্তু এরপরও গণের শত্রু, স্বাধীনতার শত্রু হিসেবে কেবল দাড়ি-টুপিই এসেছে বইপত্রে, মিডিয়ায়। কেন?

আরো পড়ুন:
বাঙলাকে যারা অস্বীকার করেছিল
ধর্মনিরপেক্ষতা ও একাত্তর

এর উত্তর হয়তো আছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের গোড়ায়। বামধারার (লালনপন্থি) লেখক ফরহাদ মজহার পর্যবেক্ষণ করেছেন (ফরহাদ মজহার, ২০২০:১২৪-১২৫)

“গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মানেই ধর্মনিরপেক্ষ বা সেক্যুলার রাষ্ট্র। আপনার ধর্ম যাই হোক, কিংবা পরিচয় যাই হোক, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আপনি স্রেফ আর দশজনের মতো নাগরিক। তাহলে (বাহাত্তরের সংবিধানে) আলাদা করে সেক্যুলারিজম ঢোকাতে হলো কেন? কারণ বাঙালি জাতীয়তাবাদ ‘বাঙালি’ বলতে বুঝেছে উচ্চবর্ণের হিন্দুর শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে নির্মিত ‘বাঙালি’কে। ‘বাঙালি’ জাতিপরিচয়ের বিপরীতে দাঁড় করানো হলো ইসলামকে। অতএব, বাঙালি জাতীয়তাবাদ ইসলাম নির্মূল না করে উচ্চ বর্ণের হিন্দুর “বাঙালিত্ব’ কায়েম করতে অক্ষম। ইসলাম নির্মূলের জন্য তাই বাঙালি জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে গণতন্ত্রের পাশাপাশি ধর্মনিরপেক্ষতাকেও আলাদা করে যুক্ত করতে হয়েছে … নাস্তিক্যবাদের আলোচনা ছাড়া সেক্যুলারিজমের সঙ্গে ইসলামের বোঝাপড়া সম্ভব না। বাংলাদেশে সেটা আরও সম্ভব না, কারণ সেক্যুলারিজম ও নাস্তিক্যবাদ এখানে প্রায় অভিন্ন, উভয়ই বাঙালি জাতীয়তাবাদী চিন্তার সমান্তরালে ঘোরতর ইসলামবিদ্বেষের উপর গড়ে উঠেছে। যার রূপ আমরা শাহবাগের আন্দোলনে দেখেছি।”

হিন্দু সংস্কৃতিকে কে বাঙালি আর মুসলমানদের সংস্কৃতিকে অবাঙালি ভাবার দায় শুধু বাঙালি জাতিবাদেরই নয়, পাকিস্তানি এলিট ও মিলিটারিদেরও ছিল। তাদের একাংশ যুদ্ধের সময় মুসলমান আর বাঙালি ভাগ করত, অনেক সময় অবাক হতো এটা দেখে যে মুসলমান আবার বাংলায় কথা কয়! ইসলামের সাথে স্রেফ উর্দু মেলানো একেবারেই অনৈসলামিক চিন্তা। কিন্তু সেকুলার জাতিবাদি রাষ্ট্রের কাঠামোতে পাকিস্তানি এলিট এই ভুল চিন্তাটাই চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল, বুঝতে ব্যর্থ হয়েছিল মুসলমানের ঐক্য আদর্শ ও ভ্রাতৃত্বে, ভাষা বা জাতিবাদে নয়। বাঙালি জাতিবাদ তারা চ্যালেঞ্জ করেনি, উলটো এক সেকুলার মতাদর্শ দিয়ে চাপা দেয়ার চেষ্টা করেছে।

৭১ এর পরে যখন মূলনীতি বানানো হয়, তখন সেই বাঙালি জাতিবাদি কনসেপ্টই যুক্ত হয়ে যায় প্রশাসনিক কাঠামোর সাথে। সম্ভবত এখানেই লুকিয়ে আছে ভাস্কর্যের বিরোধীতাকারীদের রাজাকার, পাকিস্তানের চর বলার রহস্য।


তথ্যসূত্র:
S. Sayyid (2014), Recalling The Caliphate (London: Husrt Publishers) pp. 126
শাহাদুজ্জামান (২০১৪), শাহবাগ ২০১৩ (ঢাকাঃ আগামী প্রকাশনী) পৃ. ৩৬, ৩৯, ৭১
পিনাকী ভট্টাচার্য (২০১৭), মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে ইসলাম (ঢাকাঃ গার্ডিয়ান) পৃ. ৩১-৩৫
ড. আ. আলীম (২০১৯), বাংলাদেশে চীনপন্থি বামধারার রাজনীতি (ঢাকাঃ জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ) পৃ. ২৪৫-৩৪৬
মেজর এম.এ. জলিল (২০১৯), অরক্ষিত স্বাধীনতাই পরাধীনতা (ঢাকাঃ কমল কুঁড়ি প্রকাশন) পৃ. ২৭
ফরহাদ মজহার, আধুনিক গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র মানেই সেক্যুলার রাষ্ট্র। পুনর্পাঠ, পৃ. ১২৪-১২৫ (জুলাই-সেপ্টেম্বর ২০২০)
ছবি: বিডিনিউজ২৪, ফেসবুক । মূল পোস্ট ফেসবুক ৫ ডিসেম্বর ২০২০ (সম্পাদিত)


Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email
Related Articles
Recent Articles

রাফান আহমেদ-এর বইসমূহ

আলাদাবইওয়াফিলাইফ

Copyright © Rafan Ahmed

No part of the website or posts can be published elsewhere without prior permission from author.  

Copyright © 2021 All rights reserved

error: Content is protected !!