Physician | Author | Blogger

মুক্তমনাদের সহিংস রূপের সন্ধানে

এক নজরে

নব্য-নাস্তিকদের মাঝে এককালে সেলিব্রেটি হয়ে থাকা সাংবাদিকের জবানে মুক্তমনাদের সহিংস রূপের প্রামাণিক উন্মোচন

“নব্য-নাস্তিক মুক্তমনারা বিশ্বাস করে জগতের প্রায় সকল সমস্যার জন্য কোনো-না-কোনো ধর্ম দায়ি। তাই মানব উৎকর্ষ সাধন ও পশ্চিমা সভ্যতার রামরাজ্য (utopia) কায়েম করার পথের কাঁটা হিসেবে ধর্মগুলো দাঁড়িয়ে আছে। কী সুন্দর বিশ্বাস! অথচ বিগত একশ বছরের গণহত্যাগুলো এসেছে ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধ, উপনিবেশবাদ, সমাজতন্ত্র, সাম্রাজ্যবাদ, কোরিয়ার-ভিয়েতনাম-ইরাক যুদ্ধের হাত ধরে। এগুলোর কোনোটার সাথেই ধর্মের লেনাদেনা নেই। বর্তমান পৃথিবীর গুরুতর সমস্যাগুলোর সাথেও ধর্মের কোনো সম্পর্ক নেই—যেমন আয় বৈষম্য, সম্পদের অষম বণ্টন, দারিদ্র্য, জলবায়ু পরিবর্তন, বর্ণবাদ, গণবন্দীকরণ, প্রাকৃতিক সম্পদের জন্য যুদ্ধ ইত্যাদি। পুঁজিবাদের কথাই বিবেচনা করুন। প্রচলিত ধর্মের মত এর কোনো পবিত্র ধর্মগ্রন্থ নাই, বাট এই পুঁজিবাদী “বিশ্বাসব্যবস্থার” উস্কানিতে সেকুলার পশ্চিমা বিশ্ব ৩০ লাখ ভিয়েতনামবাসি, পাঁচ লাখ ইরাকবাসিকে নিশ্চিহ্ন করে ফেলেছে। …

পুলিতজার পদকপ্রাপ্ত নামকরা সাংবাদিক ক্রিস হেজেস বলেনঃ

স্যাম হ্যারিস, ক্রিস্টফার হিচেনস-সহ নব্য-নাস্তিক মুক্তমনাদের রাজনৈতিক মানসিকতা উগ্র ডানপন্থি খ্রিস্টান মৌলবাদিদের সাথে মিলে যায়। এই মৌলবাদিরা মুসলিমদের বোম মেরে উড়িয়ে দিতে চায় কারণ তারা মনে করে মুসলিমরা সাক্ষাত শয়তান। আর নব্য-নাস্তিক মুক্তমনারা মুসলিমদের বোম মেরে উড়িয়ে দিতে চায় কারণ তারা মনে করে মুসলিমরা হলো মধ্যযুগীয়-বর্বর। উগ্র খ্রিস্টান মৌলবাদি ও নব্য-নাস্তিক মুক্তমনা একইরকমের জড়, বর্ণবাদি ও একপেশে চরিত্র।

স্যাম হ্যারিস, রিচার্ড ডকিন্স, ক্রিস্টফার হিচেনস এর সমমনা মানুষেরা সহিংস যুদ্ধ, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, নাগরিক অধিকার খর্ব করা, নির্যাতন-নিপীড়ন ইত্যাদি নানাভাবে সমর্থন দিয়েছে, বাহবা দিয়েছে। এমনকি স্যাম হ্যারিস তো আরব জাতিদের হাত থেকে বাঁচার দোহাই দিয়ে মুসলিম বিশ্বে নিউক্লিয়ার বোমা হামলা চালানোর আহ্বানও করেছে। … পুলিতজার পদকপ্রাপ্ত সেকুলার সাংবাদিক ক্রিস হেজেস নব্য-নাস্তিক মুক্তমনাদের উগ্র ডানপন্থি ধর্মীয় দলের সেকুলার ভার্সন বলে আখ্যায়িত করেছেন। অন্যদিকে বিখ্যাত ভাষাবিদ, রাজনৈতিক বিশ্লেষক নোম চমস্কি নব্য-নাস্তিক মুক্তমনাদেরকে “উগ্র ধর্মান্ধ” বলে আখ্যা দিয়েছেন। নোম চমস্কি নিজেই কিন্তু নাস্তিক। বুঝুন এবার!

ডকিনস ও তার দোসররা ওয়ার অন টেররে হাতিয়ার হিসেবে কাজ করেছে। পশ্চিমা আধিপত্যবাদের ভিত্তি এখন বাইবেল থেকে নাস্তিকতার দিকে সরে এসেছে।

— (নিধর্মী) ইংরেজ অধ্যাপক টেরি ইগেলটন —

নব্য-নাস্তিক মুক্তমনারা সেকুলার রাষ্ট্র কর্তৃক সংঘটিত সন্ত্রাসের ব্যাপারে চোখ বুঝে থাকে। তারা কোনো মতেই এই বাস্তবতা মানতে চায় না যে নন-স্টেট ভায়োলেনস (প্রচলিত কথায় জঙ্গিবাদ) সর্বদাই রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের প্রতিক্রিয়ায় হয়ে থাকে। এরপরও তাদের দ্বিমুখী নীতি হলোঃ জঙ্গিবাদ মধ্যযুগীয় ও বর্বর, কিন্তু রাষ্ট্রের সহিংসতা-আমাদের সহিংসতা বড়ই যৌক্তিক, মানবিক ও যথাযথ। … নব্য-নাস্তিকদের অধিকাংশ শ্বেতাঙ্গের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত। উন্নত দেশের সচ্ছল শহরে তারা বসবাস করে আসছে। শহুরে জীবনে আমাদের মতই কষ্টক্লেশ তারা ভোগ করেছে, কিন্তু তারা জানে না পশ্চিমা বিশ্ব যেসব দেশে উপনিবেশ স্থাপন করে ছিল, তাদের দুরবস্থা কী রকম।

তারা মোটেও জানে না দিনপ্রতি ১৫০ টাকারও কম বাজেটে সেই মানুষগুলো কীভাবে বেঁচে আছে, যাদের শাসকের ব্যক্তিস্বাধীনতা ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে। নব্য-নাস্তিক মুক্তমনারা জানে না আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বর্ণবাদি আক্রমণের স্বীকার হওয়া, বিচারহীন কারাভোগ-নির্যাতন, বোমা হামলা, দখলদারিত্বের স্বাদ কেমন লাগে। তারা জানে না ভবিষ্যতের নিয়ে প্রগাঢ় শূন্যতা বুকে বয়ে কীভাবে মানুষেরা বেঁচে আছে, তৃতীয় বিশ্বের আশাহীন জনগোষ্ঠীর মনোবেদনা তাদের স্পর্শ করে না। এই পীড়িত জনগোষ্ঠীর দুঃখ বোঝা বা নিজেকে তাদের স্থানে কল্পনা করার মানবিক দাবির বদলে নব্য-নাস্তিক মুক্তমনারা পশ্চিমের বস্তুগত সুপিরিয়রিটির বড়াই করে। মুসলিমদের ঢালাওভাবে বিমানবিকরণ করে মুখে ফেনা তুলে ফেলা এসকল মুক্তমনারা ভুলে যায় তাদের পশ্চিমা জীবনযাত্রার স্বাচ্ছন্দ্য অনেকাংশে গরিব মুসলিম শ্রমিকদের শ্রমের ফসল। …

তাদের ভণ্ডামি দেখে ফ্লোরিডা আটলান্টিক বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শ্বেতপত্রে জেফ হল লিখেনঃ

যেহারে সেকুলার/মুক্তমনা/নাস্তিকদের মাঝে গোঁড়ামির মহামারী দেখা দিচ্ছে এতে একজন নাস্তিক হিসেবে আমি খুবই শংকিত। আমার আলোচনা এটাই দেখিয়েছে মৌলবাদ খালি ধর্মের জন্য খাস না। এক নতুন প্রজাতির নাস্তিকতা আবির্ভাব হয়েছে, যে ধরা থেকে ধর্মকে মুছে ফেলতে চায়। এটা হলো মৌলবাদি নাস্তিকতা।

একুশ শতকে হালে পানি পাওয়া মুক্তমনাদের এই ধর্মকে নিশ্চিহ্ন করার বাসনা নতুন কিছু না। একই মতাদর্শে উজ্জীবিত হয়ে সোভিয়েত ইউনিয়ন, ক্যাম্বোডিয়া, আলবেনিয়া ও উত্তর কোরিয়ায় বিগত একশ বছরে ধর্ম-বিরোধী গণহত্যা চলেছে। আর এই মতাদর্শই আমেরিকার নব্য-নাস্তিক আন্দোলনের মূলমন্ত্র (একই মূলমন্ত্র নব্য-নাস্তিক মতাদর্শ প্রচারকারী দেশীয় মুক্তমনাদেরও-অনুবাদক)। নব্য-নাস্তিক মুক্তমনারা শুধু যে শ্বেত আধিপত্যবাদ সমর্থন করে তাই না, তাদের ভাষা ফ্যাসিবাদী, নব্য-নাৎসিবাদিদের মতই বর্ণবাদি চেতনাপুষ্ট। তারা আমেরিকার কু-ক্লাশ-ক্লান বা ইউরোপের পেজিদা-র মত খোলাখুলিভাবে বর্ণবাদি শব্দ ব্যবহার না করে ছুপা শব্দ ব্যবহার করে, যেমন বর্বর, মধ্যযুগীয় জঙ্গি ইত্যাদি। এছাড়া নব্য-নাস্তিকেরা উৎসাহের সাথে, কখনো আবার অজ্ঞাতসারেই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদের তাবেদারি করে।…

এই সেকুলার মৌলবাদের গোড়া কোনো পবিত্র ধর্মগ্রন্থে নয়, বরং ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্ট প্রবক্তাদের লেখাজোকায় নিহিত। সেকুলার মৌলবাদিরা জোরেশোরে এই ধারণা প্রচার করে যে ধর্ম ও ধার্মিকেরা প্রগতি ও আধুনিকতার পথে অন্তরায়—তাই একে নির্মূল করতে হবে। সেকুলার সাংবাদিক আয়কল বলেন:

এহেন মানসিকতার ফলাফল হলো কর্তৃত্ববাদি সরকারকে লাই দেয়া। এটা নিশ্চিত করা যে রাজনৈতিক ক্ষমতা যেন কেবল সেকুলার এলিটদের হাতেই থাকে। ফলে সেকুলার প্রজাতন্ত্র মূলত সকল জনগনের জন্য প্রজাতন্ত্র না হয়ে ‘সেকুলারদের জন্য প্রজাতন্ত্র’ হয়ে উঠে। তাই এসকল সেকুলার মৌলবাদিরা মনে করে সেকুলার রাষ্ট্রের কাজ হলো “ধর্মীয় সম্প্রদায়কে নিষ্পেষণ করা, ধর্মীয় শিক্ষাকে বাধাগ্রস্থ করা এবং ধর্মের কোনো রকম বহিঃপ্রকাশ-যেমন দাঁড়ি, বোরকা-নিষিদ্ধ ঘোষণা করা”।

২০ শতকের ধর্মবিরোধী গণহত্যার গোড়ায় ছিল সেকুলার মৌলবাদ ও এর চেতনাসঙ্গী ধর্মবিদ্বেষ। ধর্মবিদ্বেষী সোভিয়েত রেজিমের লোকেরা মনে করত “যুক্তি, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বৈজ্ঞানিক অগ্রগতি”র বিজয়ের লক্ষ্যে তারা ধর্মকে কচুকাটা করছে। ডেভিড ই. পাওয়েল তার গ্রন্থ Antireligious Propaganda in The Soviet Union: A Study of Mass Parsuation এ দেখিয়েছেন, সোভিয়েতপন্থিরা ধর্মবিদ্বেষী প্রোপাগান্ডা চালিয়ে ধর্মের ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টায় ব্যর্থ হয়ে এক পর্যায়ে সহিংসতার পথে বাড়ায়। … ব্রাউন ইউনিভার্সিটিতে জার্মান স্টাডিস এর অধ্যাপক ওমের বার্টাভ হলেন গণহত্যার উপর একজন বিশেষজ্ঞ। তিনি বলেন:

ডাণ্ডা হাতে মানুষ পিটিয়ে বেড়ানো নাৎসিদের বর্বর রক্ষীবাহিনীকে আমাদের বুঝতে কষ্ট হয় না, এমনকিছু তো আর মানবেতিহাসে নতুন না। কিন্তু নামকরা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনে পিএইচডি করে কিলিং স্কোয়াডের একজন কমান্ডার বনে যাওয়া ব্যক্তিকে আমরা বুঝতে পারি না। বিবস্ত্র নারী-শিশুকে পাইকারিহারে হত্যা করার যজ্ঞা নিয়েও আমাদের টনক নড়ে না, কারন আমাদের শিখানো হয়েছে এই দরিদ্র গোষ্ঠী আমাদের (স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের) প্রতি হুমকি। উদবাস্তু শিবিরের রোগ-শোক বা দুর্ভিক্ষ দেখে আমাদের টনক নড়ে না। বড়োজোর হয়তো আদিকালের মানুষকে একঘরে রাখার ইতিহাস মনে পড়ে, এই আরকি। কিন্তু নিজেরা যদি সিস্টেমেটিক মানবপাচার, দখলদারি, খুন-গুমের শিকার হতাম তাহলে হয়তো সেই নিপীড়িত মানুষগুলোর কষ্ট কিছুটা বুঝতে পারতাম নিজের সমাজের কী হত তা ভেবে। তাদের দুরবস্থার প্রতি সহানুভূতি রেখে নয়।…

দুটি বিশ্বযুদ্ধ, নাৎসি ও সোভিয়েত কর্তৃক গণহত্যা, হিরোশিমা-নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা হামলা, আবু গারিব কারাগার (সহ আরো কত কারাগারের অবর্ণনীয় নির্যাতন), কোরিয়া-ভিয়েতনাম-বল্কান-রুয়ান্ডা সহ আরো কত যুদ্ধ—এসব আমাদের দেখিয়েছে আমরা সবাই অন্যের বিরুদ্ধে এমনসব ঘৃণ্যকাজ করে থাকি যা আমরা নিজেদের ক্ষেত্রে ঘটতে দিতে চাই না। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের ঐতিহাসিক ও নামকরা সেকুলার লেখক ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন:

জ্ঞানে মুক্তি মিলবে, মানুষ আরো মানবিক ও সভ্য হয়ে উঠবে—ইউরোপীয় এনলাইটেনমেন্টের এই আশার ভিত নড়িয়ে দিয়েছে নাৎসিদের দ্বারা সংগঠিত হলোকাস্ট। এই গণহত্যার যজ্ঞ মানুষকে দেখিয়ে দিয়েছে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের কাছেই এক নামকরা বিদ্যাপিঠ ছিল, অথচ সেই বিদ্যাপীঠের জ্ঞান কাজে আসে নি। নাৎসিদের হত্যাযজ্ঞ মূলত আধুনিকতার কাছেই ঋণী। গণহত্যার এমন মহাযজ্ঞ আধুনিক পূর্বকালের কোনো সমাজে পাওয়া যায় না। …

পশ্চিমা সেকুলার সভ্যতা খোদার নামে হত্যাযজ্ঞের কারখানা চালায় না, চালায় জাতিরাষ্ট্রের দোহাই দিয়ে, জাতীয় নিরাপত্তার ধুঁয়া তুলে। ক্যারেন আর্মস্ট্রং বলেন:

সেকুলার জমানায় জাতিই বসেছে খোদার আসনে। … জাতিবাদই যখন পরম পূজ্য মূর্তি তখন এই সেকুলার জাতিবাদের প্রতি হুমকি নিঃশেষ করে দেয়া হবে নাই-বা কেন?

নব্য-নাস্তিক মুক্তমনাদের উগ্র ধর্মান্ধ আখ্যা দিয়ে নোম চমস্কি বলেন, ‘সেকুলারবাদ নিয়ে তাদের বিশ্বাসকে দমন-পীড়নের মাধ্যমে প্রচার করতে গিয়ে মুক্তমনারা সেকুলারবাদকেই একটা রাষ্ট্রীয় ধর্ম বানিয়ে ফেলেছে … রাজনীতি-ব্যবসায়ীরা যাই করবে সেটাকেই মেনে নিতে তারা জনগনকে বাধ্য করতে চায়।’


মূল: সি.জে. ওয়েরলিম্যান, দ্য নিউ এথিস্ট থ্রেট (গ্রেট ব্রিটেন: ডিএল বুকস, ২০১৫) নির্বাচিত অনুবাদ ও সম্পাদনা : রাফান আহমেদ

Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email
Related Articles
Recent Articles

রাফান আহমেদ-এর বইসমূহ

আলাদাবইওয়াফিলাইফ

Copyright © Rafan Ahmed

No part of the website or posts can be published elsewhere without prior permission from author.  

Copyright © 2021 All rights reserved

error: Content is protected !!