Physician | Author | Blogger

মুক্তচিন্তায় দেশী চ্যালেঞ্জ বনাম বিদেশী চ্যালেঞ্জ

এক নজরে

(১)

ড. ডেনিস নোবেল। অ্যামিরেটাস অধ্যাপক, অক্সফোর্ডের নামকরা জীববিজ্ঞানী ও শরীরতত্ত্ববিদ। তার জার্নাল পেপারের সংখ্যা ৬০০ এর উপরে-প্রকাশ করেছে Nature, Science, PNAS, Journal of Physiology, Progress in Biophysics and Molecular Biology, Journal of Experimental Biology ইত্যাদি। দর্শনগত অবস্থানে তিনি একজন অজ্ঞেয়বাদি, নাস্তিকও বলা চলে। বিগত বছরগুলোতে উনি ক্রমাগত নব্য-ডারউইনবাদ নিয়ে অসন্তুষ্ট হয়ে উঠেন। নব্য-ডারউইনবাদের ভিত্তিমূলক ধারণাগুলোর ব্যতিক্রম নানা পর্যবেক্ষণ বহু আগে থেকেই পাওয়া যাচ্ছিল। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে সেগুলোকে গুরুত্ব দেয়া হচ্ছিল না। তিনিসহ একদল বিবর্তনবাদি বিজ্ঞানী সিদ্ধান্ত নিলেন অ্যাকাডেমিয়ার এই নিরবতাকে ভেঙে দিবেন। সোচ্চার হবেন ডগমার বিরুদ্ধে। কপাল ভালো যে তার চাকরি টিকেছিল, অনেকের তো টিকেই নাই। অজ্ঞেয়বাদি রিচার্ড হালভোরসান অ্যাকাডেমিয়ার অবস্থা বর্ণনা করেছেন এভাবে:

ডারউইনিয় ধ্যানধারণা যে তাবৎ দুনিয়ার সবকিছুর ব্যাখ্যা দিতে পারে – এই ধারণাকে প্রশ্ন করলেই বুদ্ধিজীবী মহল থেকে আপনাকে সমাজচ্যুত করা হবে … তাদের প্রায়ই একঘরে করে ফেলা হয় কিংবা পদাবনতির সম্মুখীন হতে হয়। এমনকি কখনো কখনো তাদের পদচ্যুতও করা হয়। বেইলর ইউনিভার্সিটির এক অধ্যাপকের গবেষণার জন্য বরাদ্দ তহবিল বাতিল করা হয়েছিল—যখন কর্তৃপক্ষ জানতে পারে তার গবেষণার দ্বারা বিবর্তনের পূর্বানুমানগুলোর ভিত নড়ে যাবে। তাই দেখা যায়, অনেক বিবর্তন নিয়ে সন্দিহান অনেক অধ্যাপক ছদ্মনাম ব্যবহার করেন। কারণ বিবর্তনের বিপক্ষের যুক্তি-প্রমাণ নিয়ে প্রকাশ্যে কিছু লিখলে তাদের চাকরী চলে যেতে পারে বা ক্যারিয়ারের ক্ষতি হতে পারে।

যাই হোক। ডেনিস ও তার সহকারীরা সাহস করে প্রস্তাব করলেন সম্প্রসারিত বিবর্তনীয় তত্ত্ব⸺বললেন নব্য-ডারউইনবাদকে প্রতিস্থাপন করার সময় এসেছে। বিভিন্ন দেশে কনফারেনসে গিয়ে তিনি সাহস করে তা বলতে লাগলে। কিন্তু বিধিবাম, তার উপরে হামলে পড়লো বিজ্ঞানীকুলের একাংশ। অক্সফোর্ডে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, “পারলে নব্য-ডারউইনবাদীরা আমাদের গায়ে ফুটন্ত গরম তেল ঢেলে দিত! পাঁচ-দশ বছর ধরে তারা এই চেষ্টাই চালিয়ে এসেছে।” তারপরও থেমে থাকেন নি। চেষ্টাচরিত্র করে করে তার প্রস্তাবনা প্রকাশ করেছেন Journal of Experimental Biology (IF 2+):

In this article, I will show that all the central assumptions of the Modern Synthesis (often also called Neo‐Darwinism) have been disproved. Moreover, they have been disproved in ways that raise the tantalizing prospect of a totally new synthesis; one that would allow a reintegration of physiological science with evolutionary biology.

তার এই পেপারটি ৫৮ বার সাইট করা হয়েছে অন্যান্য জার্নাল পেপারে।(১) এছাড়াও আরো কিছু বিকল্প তত্ত্ব প্রস্তাব করা হয়েছে সেক্যুলার অ্যাকাডেমিয়ায়।

(২)

কোনো জার্নালের ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টর (IF) বা প্রভাব গুণাঙ্ক দ্বারা সেই জার্নালের মাঝে থাকা নির্দিষ্ট একটি আর্টিকেলের মান বোঝা যায় না। জার্নালের কয়েকটি আর্টিকেল বেশি বেশি সাইটেশান হলে গড়ে জার্নালের প্রভাব গুণাঙ্ক বেড়ে যায়। এটাকে ম্যানুপুলেট করা যায় আবার অনেক সময় ভালো পেপারও যথাযথ সাইটেশান পায় না। মোদ্দাকথা ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টরের সাথে কোনো একটি পেপারের বৈজ্ঞানিক আলোচনার পজিটিভ অ্যাসোসিয়েশান তেমন নাই।(২)

এর সাথে আছে পিয়ার রিভিউয়ের সাথে জড়িত সমস্যা। নামকরা জার্নাল BMJ (IF 30) এ দীর্ঘ ১৩ বছর এডিটর হিসেবে ছিলেন ড. রিচার্ড স্মিথ। এই লম্বা সময়ের অভিজ্ঞতায় তিনি কী দেখলেন? তিনি দেখলেন(৩):

পিয়ার রিভিউ একটি ত্রুটিপূর্ণ পদ্ধতিতে পরিণত হয়েছে। রিভিউ করার পরও, সহজেই চোখে পড়ে—এমন ভুল দিয়ে পেপারগুলো ভর্তি থাকছে। রিভিউয়ের কার্যকারিতার পক্ষে প্রামাণিক সমর্থনও অল্প আসছে… এরপরও পিয়ার রিভিউয়ের উপর বিজ্ঞানী ও জার্নাল সম্পাদকদের বিশ্বাসে কমতি আসে না। এমন বিশ্বাসের উপর বিজ্ঞান দাঁড়িয়ে আছে ভাবলেই তো অবাক লাগে।

অর্থাৎ স্রেফ জার্নালের ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টর বেশি ও পিয়ার রিভিউড হলেই কোনো গবেষণাপত্র নির্ভুল বা মানসম্মত হবে এমনটা জরুরি না।

(৩)

এসবই বিজ্ঞানের বাস্তবতা যা বিজ্ঞানবাদিদের চোখ এড়িয়ে যায়। বিজ্ঞান তাদের কাছে ফ্যান্টাসি, বেদবাক্য যেন। মুখে মুখে মুক্তচিন্তার বয়ান দিলেও তাদের চিন্তার জায়গাটা খুবই সীমিত। তারা ভয় পায় ভিন্ন কিছু ভাবতে। বিজ্ঞানের প্রতিটা তত্ত্বই আনুমানিক সত্যের (বা কেবল কার্যকরি কাঠামো) হিসেবে কাজ করে। জগত বুঝার চেষ্টায় আমাদের বুঝায় আমরা আসলে কতটা অজ্ঞ, আমাদের শেখায় বিনয়ী হতে। নেচার জার্নালের সিনিয়র এডিটর (নাস্তিক) ড. হেনরি গী বলেছিলেন(৪):

All scientific results are in their nature provisional – they can be nothing else… Statistics, and therefore science, can only advise on probability – they cannot determine The Truth. And Truth, with a capital T, is forever just beyond one’s grasp.

বিবর্তন তত্ত্ব বর্তমানে সর্বাধিক প্রচলিত ও গ্রহনযোগ্য বৈজ্ঞানিক ধারণা। কিন্তু কোন প্রক্রিয়ায় হচ্ছে, কোনটা কোন ক্ষেত্রে প্রধান, কোনটার কি সীমাবদ্ধতা এসব নিয়ে বিজ্ঞানীরা নানামত দেন। পাশাপাশি বিজ্ঞান কিভাবে কাজ করে, পর্যবেক্ষণ আর তত্ত্বের ফারাক কী, বিজ্ঞানের সিদ্ধান্তগুলো চূড়ান্ত কিনা, বিজ্ঞান আসলে কোন সীমার মাঝে কাজ করে—এসব আলাপ প্রাথমিক শিক্ষা হিসেবে বোঝা দরকার। আমিও সেটাই দেখাতে চেষ্টা করেছিলাম আমার বইতে। মানুষ যাতে বিজ্ঞান নিয়ে অতিমুগ্ধতা ত্যাগ করে বাস্তবিক চিন্তা করতে পারে, বিবর্তনকে নাস্তিকতার হাতিয়ার বানিয়ে ধর্মবিদ্বেষ চারিয়ে তুলতে যাওয়ার আগে সভ্য হয়। বিজ্ঞানকে বিজ্ঞানের জায়াগায় রাখে এবং বিজ্ঞানবাদ দ্বারা কলুষিত না করে।

(৪)

বিজ্ঞানের নিজস্ব কর্মধারা, বিশ্বাস ও প্রতিজ্ঞা আছে। হালফিলের বিজ্ঞান চেষ্টা করে জাগতিক ঘটনার ব্যাখ্যা হিসেবে স্রেফ জাগতিক কার্যকারণ দাঁড় করাতে। এটা তার দর্শগত প্রতিজ্ঞা যা কেতাবি ভাষায় মেথডলজিক্যাল ন্যাচারালিজম বা প্রকৃতিবাদ বলে পরিচিত। মানুষ ভাবে স্রষ্টার নজির নাই বলে বিজ্ঞান খুঁজে পাই নাই, আদতে ঘটনা উলটা। বিজ্ঞান আগে থেকেই প্রতিজ্ঞা করে নিয়েছে স্রষ্টার আলোচনা আমার এখতিয়ারে নাই। তাই আমি স্রেফ জগত নিয়ে ব্যস্ত থাকবো। আমেরিকার ন্যাশনাল অ্যাকাডেমি অফ সায়েনসেস-এর স্বাক্ষ্য জানায়:

বিজ্ঞান হলো প্রাকৃতিক জগৎ সম্পর্কে জ্ঞান অর্জনের একটি উপায়। প্রাকৃতিক জগৎ সম্পর্কে জাগতিক ব্যাখ্যা-প্রদানেই এটি সীমাবদ্ধ। অলৌকিক কিছু আছে কি না, সে বিষয়ে বিজ্ঞান কিছুই বলতে পারে না। স্রষ্টা আছেন নাকি নেই—এ প্রশ্নের ব্যাপারে বিজ্ঞান নীরব। [আমেরিকান ন্যাশনাল একাডেমি অফ সাইন্স, ১৯৯৮]

বিবর্তন হলো প্রানের বিকাশ ব্যাখ্যায় জাগতিক চেতনার তত্ত্ব। তার কাজই হলো প্রাণের বিকাশে কেবল জাগতিক কারন বিচার করা। তাই নানাবিধ বিবর্তন প্রস্তাবনা ছাড়া ভিন্নকিছু বৈজ্ঞানিক জার্নালে কখনোই স্থান পাবে না। তাই ইম্প্যাক্ট ফ্যাক্টর দশ দিয়া দেখাও বিবর্তন ভুল বলা তুলনা হলো⸺রুটলেজের থিওলজি ও সায়েনস জার্নালে গিয়া দেখাও থিওলজি ভুল⸺এমনটা বলার সমতুল্য। তাছাড়া উপরে আমরা দেখলাম বিবর্তনকে চ্যালেঞ্জ করলে আপনার চাকরিই চলে যাবে এমন অবস্থা, তাহলে কীভাবে আশা করেন জার্নালে বিবর্তনের কেন্দ্রিয় অনুকল্পকে প্রশ্ন করাকে তারা প্রশ্রয় দিবে?

যে জ্ঞানচর্চার কাঠামোই বিবর্তনকেন্দ্রিক সে কোন দুঃখে সেটাকে ভুল বলতে যাবে? বিজ্ঞানের দর্শনের পাঠ্যবই ঘেঁটে থিওরি লেডেননেস কাকে বলে একটু পড়ে নেন না। তাছাড়া আপনারা কী ভুলে গেছেন নামকরা (নাস্তিক) বিবর্তনবাদি জিনবিদ ড. রিচার্ড লেউনটিন কী স্বীকার করেছিলেন:

আমরা আগে থেকেই প্রকৃতিবাদের নিকট প্রতিজ্ঞাবদ্ধ। ব্যাপারটা এমন নয় যে—এই বিস্ময়কর জগৎ সম্পর্কে একটি জাগতিক ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি ও প্রতিষ্ঠানগুলো আমাদের বাধ্য করে। বরং, শুরু থেকেই প্রকৃতিবাদের প্রতি আনুগত্যের কারণে আমরা বাধ্য হই, জগৎ অনুসন্ধানের এমন কিছু উপকরণ ও ধারণা তৈরি করতে—যা কেবল জাগতিক ব্যাখ্যারই জন্ম দেবে। সে ব্যাখ্যা যতই কাণ্ডজ্ঞানহীন হোক, আমজনতার কাছে যতই দুর্বোধ্য ঠেকুক! আসল কথা হলো, আমরা ঈশ্বর নিয়ে কথাবার্তা সহ্য করব না। তাই আমাদের নিকট প্রকৃতিবাদ ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

(৫)

প্রাণ, জেনেটিক কোড তথা ইনফরমেশান কীভাবে স্রেফ জাগতিক প্রক্রিয়ায় আপনা আপনি উৎপন্ন হলো তা আজও আমরা জানি না। কীভাবে প্রাণহীন ক্যামিকেল থেকে প্রাণের তথ্য আসলো কোনোরকম ডিজাইন ছাড়া? সেই জানার আগ্রহ থেকে কিছুদিন আগে প্রায় ১০ মিলিয়ন (১ কোটি) ডলারের পুরষ্কার ঘোষণা করা হয়েছে লন্ডনের রয়াল সোসাইটিতে। এট জানা গেলে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এ বিপ্লব আসবে বলে মনে করেন পুরস্কারদাতা বিজনেজ ম্যাগনেটরা। তারা কোনো ইম্প্যাক্ট ফ্যাকটরের বাধাধরা নিয়ম দেন নাই। জার্নালেও পাবলিশ করা লাগবে না। এই লিংকে যান।

সো টেক দ্য চ্যালেঞ্জ। বেস্ট অফ লাক!


দোসরা মার্চ ২০২১, ফেসবুক (সম্পাদিত)

Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email
Related Articles
Recent Articles

রাফান আহমেদ-এর বইসমূহ

আলাদাবইওয়াফিলাইফ

Copyright © Rafan Ahmed

No part of the website or posts can be published elsewhere without prior permission from author.  

Copyright © 2021 All rights reserved

error: Content is protected !!