Physician | Author | Blogger

আলেক্সান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি যারা ধ্বংস করেছিলো

এক নজরে

“৬৪০ খ্রিস্টাব্দে মুসলমানরা আলেকজান্দ্রিয়া জয় করে; তাদেরও জ্ঞানের আগ্রহ ছিলো না; রাজ্য, জয় আর ক্ষমতার উল্লাসে তারা পুড়িয়ে দেয় আলেকজান্দ্রিয়ার মহাগ্রন্থাগার, নষ্ট হয়ে যায় অনেক মূল্যবান গ্রিক বই ও জ্ঞান । …”

হুমায়ুন আজাদ, মহাবিশ্ব; পৃ. ৩০ (ঢাকা: আগামী প্রকাশনী, ২য় সংস্করণ জুন ২০০৭)

“আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগার পুড়িয়ে ফেলা হয়েছিল মুসলিম খলিফা হযরত ওমর রাঃ এর নেতৃত্বে । যার ফলে বহু স্ক্রোল ও বই চিরতরে নষ্ট হয়ে যায়। আলেকজান্দ্রিয়ার প্রাচীন গ্রন্থাগারের অগ্নিকাণ্ড তাই সাংস্কৃতিক জ্ঞান ধ্বংসের প্রতীক । আজ পর্যন্ত বিশ্বের জ্ঞানী ব্যাক্তি ও গবেষকেরা এর অভাব অনুভব করেন।”

মৃত কালপুরুষ, ইস্টিশন ব্লগ

প্রস্তাবনা

কথাগুলো এক কালের সমালোচিত, নার্সিসিস্ট নাস্তিক ড. হুমায়ুন আজাদের মহাবিশ্ব  বইয়ে পেলাম। এই অভিযোগ বেশ পুরনো। এত বছর পরে দেখলাম নাস্তিকদের ব্লগ ইস্টিশন-এ ‘মৃত কালপুরুষ’ নামের একজন ব্লগারও একই কথা লিখেছেন। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, বিখ্যাত বীর আলেকজান্ডারের পরে খ্রিস্টপূর্ব তিন শতকের দিকে মিশরের শাসনভার গ্রহণ করেন টলেমি-২। যিনি মিশরের আলেকজান্দ্রিয়াতে সুবিশাল এক গ্রন্থাগার স্থাপন করেন, সে আমলেই এতে বইয়ের সংখ্যা ছিলো প্রায় পাঁচ লক্ষ! ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা উমার ইবনুল খাত্তাব (রা) এর শাসনকালে মিশর বিজিত হয়, সেখানকার গভর্নর নিযুক্ত করা হয় বিখ্যাত সাহাবী আমর ইবনুল আ‘স-কে (রা)।

বলা হয়ে থাকে আমর ইবনুল আ‘স আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগারের ব্যাপারে করণীয় সম্পর্কে খলিফা উমারকে (রা) জিজ্ঞেস করলে তিনি নাকি বলেন, গ্রীকদের এই বইগুলো যদি আল্লাহ্‌র কিতাবের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হয়, তবে সেগুলো অপ্রয়োজনীয় আর তাই সংরক্ষণের কোনো দরকার নেই; আর যদি সাংঘর্ষিক হয় তবে এগুলো ক্ষতিকর, তাই এগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়াই উচিত। উমারের (রা) এই কথা শুনে নাকি আলেকজান্দ্রিয়ার গ্রন্থাগার জ্বালিয়ে দেওয়া হয়! বইগুলো গোসলখানার পানি গরম করার কাজে পুড়ানো হতে থাকে। সব বই পুড়তে নাকি দীর্ঘ ছয়মাস লেগেছিলো! বাংলাদেশের জনপ্রিয় লেখক ও বিজ্ঞান প্রচারক ড. জাফর ইকবাল এই গল্প আরো একটুখানি বিজ্ঞান বইতে উল্লেখ করেন এভাবেঃ

“আলেকজান্দ্রিয়ার সেই লাইব্রেরি একদিন পুড়ে ছাই করে দেয়া হলো – ঠিক কারা সেটি করেছিল সেটা নিয়ে অনেক বিতর্ক রয়েছে৷ কথিত আছে লাইব্রেরির বইগুলো পুড়িয়ে গোসলখানার পানি গরম করা হয়েছে – দশ লক্ষের উপর বই পুড়িয়ে শেষ করতে সময় লেগেছে ছয় মাস থেকেও বেশি। পৃথিবীর ইতিহাসে এর থেকে হৃদয়বিদারক কোনো ঘটনা আছে বলে জানা নেই।”

ড. জাফর ইকবাল, আরো একটুখানি বিজ্ঞান, পৃ. ২৩ (ঢাকা: কাকলী প্রকাশনী, ৬ষ্ঠ মুদ্রণ ফেব্রুয়ারি ২০১২)

জাফর স্যার সরাসরি মুসলিমদের দোষ দেন নি, একটু ঘুরিয়ে বলেছেন আরকি! তো আসল ইতিহাসটা কি? চা তৈরি তো? চুমুক দিতে দিতে পড়া শুরু করুন।

আরো পড়ুন: নালন্দা মঠ কী বখতিয়ার খিলজি ধ্বংস করেছিলেন?

অভিযোগ বিশ্লেষণ

মুসলমানরা মিশর বিজয় করে ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে। আর উপরে বর্ণিত ঘটনাটির প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় বাগদাদের চিকিৎসক আব্দুল লতিফের (১১৬২-১২৩১ খ্রি.) সূত্রে। অর্থাৎ মুসলিমদের মিশর বিজয়ের প্রায় ৬০০ বছর পরে! অথচ নাস্তিক মৃত কালপুরুষ  তার লেখায় নির্জলা মিথ্যা বলেছেন-বিভিন্ন হাদিসে নাকি এ ঘটনার উল্লেখ আছে! বেচারা হাদিস কাকে বলে সেটাই জানে না! যাই হোক, আব্দুল লতিফের পরে আল কিফতি (১১৭২-১২৪৮ খ্রি.) এই ঘটনাটি তার সূত্রে উল্লেখ করেন। এই দু’জনের বরাতে সিরিয়ার ইসলামবিদ্বেষী খ্রিস্টান যাজক বারহেব্রাইয়াস (যার অপর নাম আবুল ফারাজ) ঘটনাটি তার লেখনিতে নিয়ে আসেন। ১৬৬৩ সালে এডওয়ার্ড পোকক এই লেখার কিছু অংশের ল্যাটিনে অনুবাদ করেন, সেখান থেকেই এই কাহিনী পশ্চিমে প্রবেশ করে। মজার ব্যাপার হলো, নাস্তিকদের  অন্যান্য অনেক দাবির মতো এই দাবিও ভিত্তিহীন, মিথ্যা।

“আলেকজান্দ্রিয়ার জাদুঘর ও লাইব্রেরি খ্রিস্টিয় ৩য় শতকের গৃহযুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়; এর সম্পূরক লাইব্রেরিটি ৩৯১ খ্রিস্টাব্দে খ্রিস্টানরা ধ্বংস করে দেয় ।”

Britannica Concise Encyclopedia, p. 44

নিউ ওয়ার্ল্ড এনসাইক্লোপিডিয়ার মতে, উমারের (রা) নামে প্রচলিত এই ঘটনা বানোয়াট। খ্রিস্টানরা বানিয়ে এই গল্প প্রচার করেছে। নাস্তিক ব্লগার মৃত কালপুরুষ বলেছেন:

“প্রাচীন গ্রন্থগুলিতে এই অগ্নিকাণ্ডের সময় নিয়ে বিতর্ক পাওয়া যায় মুসলিম সম্প্রদায়ের ভেতরে । তাদের ভাষ্য এটা মুসলমানেরা করেনি। কে এই অগ্নিসংযোগ ঘটিয়েছিলেন তা নিয়েও মতান্তর তৈরি করা হয়েছে । … তবে এটাই সব চেয়ে বেশি গ্রহনযোগ্য যে, ৬৪২ খ্রিস্টাব্দে মুসলমান খলিফা হযরত ওমর (রাঃ) এর দ্বারা এই লাইব্রেরি ভস্মীভুত হয় ।”

“আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি খলিফা (উমার) ধ্বংস করেছিলেন এই গল্প প্রত্যেক খ্রিস্টানকেই শিখানো হয়। কিন্তু আসল ঘটনা হলো, এই লাইব্রেরি বারবার ধ্বংস হয়েছে, আবার গড়া হয়েছে। সর্বপ্রথম একে ধ্বংস করেন (সম্রাট) জুলিয়াস সিজার, আর শেষবার যখন একে ধ্বংস করা হয় সে সময়টা ছিলো নবী (মুহাম্মাদ) এর জন্মেরও আগে।”

বার্ট্রান্ড রাসেল

তার লেখা পড়ে মনে হয়, সত্য ধামাচাপা দেওয়ার জন্য মুসলিমরা ইচ্ছে করে এই ঘটনা নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় তার এই দাবিও নির্জলা মিথ্যা, মিথ্যা! মুসলিম ঐতিহাসিকগণ যথেষ্ঠ গবেষণার পরই এই ঘটনার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তাছাড়া অগ্নিকাণ্ড নিয়ে বিতর্কের নজীর নাস্তিকদের পরমপূজ্য পশ্চিমা গবেষকদের লেখাতেই ভুরিভুরি পাওয়া যায়। যেমন, ইসলামের কড়া সমালোচক প্রাচ্যবিদ পি.কে. হিট্টি বলেন:

“খলিফার (উমরের) আদেশে (সাহাবি) আমর (ইবনুল আ‘স) দীর্ঘ ছয় মাস যাবত শহরের অগণিত গোসলের পানি গরমের চুল্লি জ্বালানোর কাজে আলেকজান্দ্রিয়া গ্রন্থাগারের কিতাবাদি ব্যবহার করেছিলেন – এই গল্প এমনই এক কিচ্ছা যা অলীক কাহিনী হিসেবে ভালো হলেও ইতিহাস হিসেবে নিকৃষ্ট । এই বিশাল টলেমিয় গ্রন্থাগারটি প্রায় ৪৮ খ্রিস্টপূর্বাব্দে জুলিয়াস সিজার পুড়িয়ে দেন । অপর গ্রন্থাগার যা ডটার লাইব্রেরি হিসেবে পরিচিত ছিলো, সেটা প্রায় ৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট থিওডোসিয়াসের হুকুমে ধ্বংস করে দেওয়া হয় । তাই আরবদের মিশর জয়ের সময় উল্লেখ করার মতো গ্রন্থাগারই আলেকজান্দ্রিয়ায় ছিলো না । সে কারণেই সমসাময়িকদের কেউই আমর বা উমারের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ চাপায় নি । সর্বপ্রথম এই গপ্পো আব্দুল লতিফ আল-বাগদাদি বর্ণনা করেন বলে প্রতীয়মান হয়, যার মৃত্যু হয় ৬২৯ হিজরিতে (১২৩১ খ্রিস্টাব্দ) । কেন যে তিনি এই আকাজ করলেন তা তো আমরা জানি না, তবে তার গপ্পোই পরবর্তীতে কপি করে তাতে রঙ চড়ানো হয়েছে ।”

Philip K. Hitti, History of The Arabs; p. 166 (Macmillan International Higher Education, 2002)

ড. আজাদ ও রিচার্ড ডকিন্সের জ্ঞানপিতা অজ্ঞেয়বাদি বার্ট্রান্ড রাসেল বলেন:

“আলেকজান্দ্রিয়ার লাইব্রেরি খলিফা (উমার) ধ্বংস করেছিলেন এই গল্প প্রত্যেক খ্রিস্টানকেই শিখানো হয় । কিন্তু আসল ঘটনা হলো, এই লাইব্রেরি বারবার ধ্বংস হয়েছে, আবার গড়া হয়েছে । সর্বপ্রথম একে ধ্বংস করেন (সম্রাট) জুলিয়াস সিজার, আর শেষবার যখন একে ধ্বংস করা হয় সে সময়টা ছিলো নবী (মুহাম্মাদ) এর জন্মেরও আগে ।”

Bertrand Russell, Human Society in Ethics and Politics; p. 218 (Routledge, 2013)

ইসলামের কড়া সমালোচক বার্নাড লুইস স্বীকার করেছেন, এই কল্পকাহিনী ১৮শ শতক থেকে আজ পর্যন্ত ইউরোপিয় পণ্ডিতমহলে মিথ্যা, বানোয়াট ও অসম্ভব হিসেবে প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। ড. আজাদ, মৃত কালপুরুষের মতো প্রকাশ্য নাস্তিক ও কিছু সুপ্ত নাস্তিকমনা ব্যাক্তি এতো গবেষণা করতে যান নি, পশ্চিমের কোনো ধর্মবিদ্বেষী বইয়ে পেয়েছেন, আর যাচাই ছাড়াই নিজের বইয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। নাস্তিকরা নাকি সত্য সন্বেষী! কই, তাদের কাউকে দেখেছেন মোঙ্গল চেঙ্গিস খা (আসল উচ্চারণ গেঙ্গিস হান) ও তার হন্তারক বাহিনী কর্তৃক বাগদাদের লাইব্রেরি পুড়ানো নিয়ে মাতামাতি করতে? মুসলিম মরলে নাস্তিকেরা হয়তো আনন্দ পান, কিন্তু এত বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার ধ্বংস করা হলো এটা নিয়ে কাউকে হাউকাউ করতে দেখা যায় না! উল্টো মুক্তমনা ব্লগে তাকে হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ মানুষ বানানোর অপচেষ্টা চলে হোরাস নামের নাস্তিকের কলমে! কেন এই দ্বিমুখীতা? চেঙ্গিসের হাতে মারা যাওয়া বেশীরভাগ লোকই মুসলিম – এটাই হোরাসের উচ্ছ্বাসের কারণ?

ইতিহাস বলে, খারাজাম মুসলিম সাম্রাজ্যকে পদানত করে লক্ষ লক্ষ মুসলিম হত্যা করেন। তারই ধারাবাহিকতায়, যোগ্য উত্তরসুরী হালাগু খা বাগদাদে মুসলিম আব্বাসীয় খেলাফার পরিসমাপ্তি টানেন অবর্ণনীয় সন্ত্রাস আর হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে। এটা নিয়ে হোরাসের অভিযোগ নেই! অথচ তারিক বিন জিয়াদের স্পেন বিজয়কে এই ব্যক্তি তরবারীর বিজয় আখ্যা দেন, আর ভুলে যান তারিকের বসানো ভিত্তির উপরেই তৈরী হয়েছে কর্ডোবার প্রাণবন্ত প্রকৃত মুক্তচিন্তার সমাজ যা ইউরোপে রেনেসাকে কিছুটা হলেও উদ্দীপিত করেছে।

আলেক্সান্দ্রিয়া ধ্বংসের বানোয়াট গল্পে মৃত কালপুরুষ, হোরাস ও মুক্তমনা গংদের অন্তরে ছুরিকাঘাত বসে যায়। কিন্তু এই সুশীল মুক্তমনারা আবার বাগদাদের লাইব্রেরির ধ্বংসের সুপ্রতিষ্ঠিত ইতিহাসকে ভুলে গিয়ে, যারা এই অন্যায় করেছেন তারা যে কত মহান ছিলেন তা নিয়ে মুক্ত আলোচনার আয়োজন করেন। আর কতো বলবো! পাঠকরাই বিচার করুন। [বিস্তারিত]


লেখাটি নিচের অবিশ্বাসী কাঠগড়ায় এর ২য় সংস্করণ থেকে চয়িত। পরিমার্জিত নতুন সংস্করণে এই বিষয়ে খুব সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে।

Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email
Related Articles
Recent Articles

রাফান আহমেদ-এর বইসমূহ

আলাদাবইওয়াফিলাইফ

Copyright © Rafan Ahmed

No part of the website or posts can be published elsewhere without prior permission from author.  

Copyright © 2021 All rights reserved

error: Content is protected !!