Physician | Author | Blogger

বাঙলাকে যারা অস্বীকার করেছিল

এক নজরে

প্রগতিশীল সমাজে একটা ভুল ধারণা বহুল প্রচারিত। তারা ভাবে বাঙলা = হিন্দুয়ানি। এই ভুল ধারণা নিয়ে অনেক চিন্তকই মুখ খুলেছেন। কিন্তু আফসোস, কান থাকলেই সবাই যে শুনে এমন নয়, মাথা থাকলেও সবাই যে ভাবে এমন নয়। বাঙলার আসল রূপ মূলত আরবি-ফারসি সমৃদ্ধ রূপ। মুসলিম সুলতানদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাঙলা বেড়ে উঠেছে, যেসময় বাংলাকে হিন্দু ব্রাহ্মন সমাজ ইতরের ভাষা বলত। প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ, গবেষক, লোক-সাহিত্যবিশারদ, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসকার দীনেশচন্দ্র সেন-এর বহুল আলোচিত প্রবন্ধে জানা যায়(১):

“মুসলমান আগমনের পূর্বে বঙ্গভাষা কোনো কৃষক রমণীর ন্যায় দীনহীন বেশে পল্লী কুটিরে বাস করিতেছিল৷… সকল অপূর্ব গুণ লইয়া বাঙ্গলা ভাষা মুসলমান প্রভাবের পূর্বে অতীব অনাদর ও উপেক্ষায় বঙ্গীয় চাষার গানে কথঞ্চিত আত্মপ্রকাশ করিতেছিল৷ … ইতরের ভাষা বলিয়া বঙ্গভাষাকে পণ্ডিতমণ্ডলী ‘দূর দূৱ’ করিয়া তাড়াইয়া দিতেন, হাড়ি-ডোমের স্পর্শ হইতে ব্রাহ্মণেরা যেরূপ দূরে থাকেন বঙ্গভাষা তেমনই সুধী সমাজের অপাংক্তেয় ছিল-তেমনি ঘৃণা, অনাদর ও উপেক্ষার পাত্র ছিল৷

মুসলমান বিজয় বাঙ্গলা ভাষার সেই শুভদিন, শুভক্ষণের সুযোগ আনয়ন করিল৷ গৌড়দেশ মুসলমানগণের অধিকৃত হইয়া গেল৷ তাঁহারা ইরান-তুরান যে দেশ হইতেই আসুন না কেন, বঙ্গদেশ বিজয় করিয়া বাঙ্গালী সাজিলেন। আজ হিন্দুর নিকট বাঙ্গলাদেশ যেমন মাতৃভৃমি, সেদিন হইতে মুসলমানের নিকট বাঙ্গলাদেশ তেমনই মাতৃভুমি হইল৷ তাঁহারা এদেশে আসিয়া দস্তুরমত এদেশবাসী হইয়া পড়িলেন৷ হিন্দুর নিকট বাঙ্গলা ভাষা যেমন আপনার, মুসলমানদের নিকট উহা তদপেক্ষা বেশী আপনার হইয়া পড়িল৷ বঙ্গভাষা অবশ্য বহু পূর্ব হইতে এদেশে প্রচলিত ছিল, বুদ্ধদেবের সময়ও ইহা ছিল, আমরা ললিত বিস্তরে তাহার প্রমাণ পাইতেছি। কিন্তু বঙ্গ-সাহিত্যকে একরূপ মুসলমানের সৃষ্টি বলিলেও অত্যুক্তি হইবে না। …

গৌড়ের মুসলমান সম্রাটগণ হয়ত হিন্দু পণ্ডিত দ্বারা সংস্কৃত পুরাণের বঙ্গানুবাদ সংকলনের প্রথা প্রচলন করিয়াছিলেন … আমাদের নিঃসন্দেহভাবে এই ধারণা বদ্ধমূল হইয়াছে যে, গৌড়েশ্বরগণের সহায়তা না পাইলে বঙ্গভাষা মাথা উঁচু করিয়া সুধী সমাজে দাঁড়াইতে পারিত না, মাথা হেঁট করিয়া পল্লীর এক কোণে চির উপেক্ষিতা হইয়া পড়িয়া থাকিত। …

এই সকল পুস্তক যে বাঙ্গলা ভাষায় বিরচিত হইতেছিল, ব্রাহ্মণগণ উহা কিরূপ চক্ষে দেখিতেন, তাহা তাহাদের রচিত কয়েকটি সংস্কৃত শ্লোক ও বাঙ্গলা প্রবাদ বাক্য হইতে পরিষ্কারভাবে জানা যায় । “অষ্টাদশ পুরাণমণি রামস্য চরিতানিচ ৷ ভাষায়াং মানবং শ্রুত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ” অর্থাৎ অষ্টাদশ পুরাণ ও রামায়ণ যাহারা বাঙ্গলা ভাষায় শ্রবণ করিবে, তাহারা রৌরব নামক নরকে গমন করিবে।

এহেন প্রতিকূল ব্রাহ্মণ সমাজ কি হিন্দু রাজত্ব থাকিলে বাঙ্গলা ভাষাকে রাজসভার সদর দরজায় ঢুকিতে দিতেন? সুতরাং এ কথা মুক্তকঠে বলা যাইতে পারে যে, মুসলমান সম্রাটেরা বাঙ্গলা ভাষাকে রাজ দরবারে স্থান দিয়া ইহাকে ভদ্র সাহিত্যের উপযোগী করিয়া নূতনভাবে সৃষ্টি করিয়াছিলেন। … মুসলমান রাজ-রাজারা যে রীতি প্রবর্তন করেন, তাহা ব্রাহ্মণগণের নিষেধ-বিধি ও উপেক্ষা অগ্রাহ্য করিয়া প্রচলিত হইয়াছিল; শাহানশাহ বাদশাহগণ যাহা করিলেন, ছোট ছোট হিন্দু রাজন্যবর্গ তাহার অনুকরণ করিতে লাগিলেন ৷ এইভাবে বঙ্গভাষা ক্ষুদ্র-বৃহত রাজসভায় প্রতিষ্ঠা পাইয়া বিজয়ী হইল…”

দেশভাগের আগেই সাহেবরা নতুন একটা চক্রান্ত করেন। বাঙলাকে এর ঐতিহ্য থেকে সরিয়ে বিভক্তির গোড়ায় পানি সিঞ্চন করার লক্ষ্যে বাংলাকে বদলাতে শুরু করেন। আরবি-ফারসি সরিয়ে ঢুকাতে থাকেন সংস্কৃত শব্দ-যাকে আজকে আমরা প্রমিত বাঙলা বলি। যদ্যপি আমার গুরু খ্যাত জাতীয় অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক স্যার মনে করতেন, বর্তমানে প্রমিত বাংলার যে-রূপ দাঁড় করানো হয়েছে তা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত এবং ইংরেজদের সাম্প্রদায়িকতা বিস্তারের হাতিয়ার হিসেবে। এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন(২):

‘বাংলা ভাষার মধ্যে যে পরিমাণ এলিট মাস গ্যাপ এরকম দুনিয়ার অন্য কোনো ভাষার মধ্যে খুঁজে পাইবেন কিনা সন্দেহ। আধুনিক বাংলা ভাষাটা ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা সংস্কৃত অভিধান দেইখা দেইখা বানাইছে। আসল বাংলা ভাষা এই রকম আছিল না। আরবি-ফারসি ভাষার শব্দ বাংলা ভাষার লগে মিশ্যা ভাষার একটা স্ট্রাকচার খাড়া অইছিল। পলাশীর যুদ্ধের সময়ের কবি ভারতচন্দ্রের রচনায় তার অনেক নমুনা পাওয়া যাইবো। ব্রিটিশ শাসন চালু হইবার পরে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা আরবি-ফারসি শব্দ ঝাঁটাইয়া বিদায় কইরা এই জায়গায় সংস্কৃত শব্দ ভইরা থুইছে। বাংলা ভাষার চেহারা কেমন আছিল পুরানা দলিলপত্র খুঁইজা দেখলে কিছু প্রমাণ পাইবেন। ফোর্ট উইলিয়াম কলেজের পণ্ডিতেরা ভাষারীতির স্ট্রাকচারটা খাড়া করেছিলেন। তার লগে ভাগীরথী পাড়ের ভাষার মিশ্রণে আধুনিক বাংলা ভাষাটা জন্মাইছে। আধুনিক বাংলা বঙ্গসন্তানের ঠিক মুখের ভাষা না। এটা লেখাপড়া শিইখ্যা লায়েক অইলে তখনি তার মুখে আসে। বাংলা ভাষার সঙ্গে মুসলমানদের যে সম্বন্ধ ছিল তা ‘কাস্ট হিন্দুদের’ চেয়ে অনেক নিকটতর’

সুতরাং আমরা বুঝতে পারছি বাঙলাকে সম্মান দিয়েছে মুসলিমরা। ইংরেজদের এই ষড়যন্ত্রের প্রতিক্রিয়া হিসেবে উপনিবেশকালের উলামারা বাঙলার প্রতি অবহেলা করেছিলেন, কিন্তু সেটাও ছিল হিন্দুত্ববাদি ও উপনিবেশী আগ্রাসনের ফলে। এই ইতিহাস কয়জন জানে? কিছুদিন আগে একজন শাহবাগি সাংবাদিককে বলতে দেখা গেল:

ইতিহাস সম্পর্কে কত গভীর অজ্ঞতা। এই ভদ্রলোকের মত ছদ্মহিন্দুত্ববাদিরা কী আসলেই জানেন কারা গাদ্দার? তারা নাকি তারা?

পুনশ্চ: গাদ্দার শব্দটা সংস্কৃত নয়।


তথ্যসূত্র:
(১) দীনেশচন্দ্র সেন, বঙ্গভাষার উপর মুসলমানের প্রভাব। প্রবন্ধটি সংকলিত হয়েছে: – হুমায়ুন আজাদ (সম্পাদিত), বাঙলা ভাষা ২য় খণ্ড, পৃ. ৫৯৭-৬২০ (ঢাকা: আগামী প্রকাশনী, ২য় মুদ্রণ ২০১৫)- মোশাররফ হোসেন খান (সম্পাদিত), বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে মুসলিম অবদান, পৃষ্ঠাঃ ১৮-৩০ (ঢাকা: বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, ১ম প্রকাশ ১৯৯৮)
(২) জাহিদুর রহিম, অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাকের ইতিহাস-চেতনা। কালি ও কলম, ২২ অক্টোবর ২০১৯


Share This
Share on facebook
Share on twitter
Share on linkedin
Share on whatsapp
Share on email
Related Articles
Recent Articles

রাফান আহমেদ-এর বইসমূহ

আলাদাবইওয়াফিলাইফ

Copyright © Rafan Ahmed

No part of the website or posts can be published elsewhere without prior permission from author.  

Copyright © 2021 All rights reserved

error: Content is protected !!